মাগুরার শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় সাধারণ মানুষের প্রধান আতঙ্ক ছিল সংঘবদ্ধ চোর চক্রের দৌরাত্ম্য। বহির্বিভাগের টিকিট লাইন, ওষুধ বিতরণের কাউন্টার কিংবা জরুরি বিভাগের সামনে প্রতিনিয়ত ঘটছিল মোবাইল ফোন ও টাকা এবং স্বর্ণলংকার চুরির ঘটনা। তবে হাসপাতাল প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি আনসার সদস্য মোতায়েন এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তান্তরের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন পর হাসপাতালের ভেতরে চোরের উপদ্রব অনেকটাই কমে এসেছে এবং সাধারণ রোগী ও রোগীর স্বজনদের মাঝে স্বস্তি ফিরছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে গ্রামীণ এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। এই সরলতার সুযোগ নিয়ে হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী চোর চক্র। চোর চক্রের সদস্যরা মূলত রোগী বা রোগীর স্বজন সেজে লাইনে দাঁড়াত। এরপর ভিড়ের সুযোগ নিয়ে নারীদের ভ্যানিটি ব্যাগ কেটে বা পকেট থেকে নগদ টাকা ও দামি মোবাইল ফোন হাতিয়ে নিয়ে দ্রুত চম্পট দিত।
উপজেলার শ্রীকোল ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে আসা বৃদ্ধা আমেনা বেগম তার তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “এর আগে নাতির জ্বরের ওষুধ নিতে এই হাসপাতালে এসেছিলাম। টিকিট কাটার লাইনে প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে কে যেন আমার ভ্যানিটি ব্যাগ কেটে তিন হাজার টাকা আর সাধের মোবাইল ফোনটা নিয়ে যায়। ওষুধ তো দূরের কথা বাড়িতে ফেরার ভাড়াটুকু ছিল না। আজ এসে দেখছি লাইনে আনসার ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে আছে কোন ভিড় বা ধাক্কাধাক্কি নেই। আগে যদি এই নিরাপত্তা থাকতো তবে আমার মত গরীব মানুষের টাকা ও মোবাইল খোয়া যেত না।”
হাসপাতালের এই বিশৃঙ্খলা ও চুরির ঘটনার লাগাম টানতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার এবং রোগী ও স্বজনদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নবনিযুক্ত আনসার সদস্যদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তান্তর করা হয়েছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.আল ইয়াসিন শুভ নিলয় আনসার সদস্যদের হাতে এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দেন। এ সময় তিনি হাসপাতালের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং রোগীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে আনসার বাহিনীকে অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
অস্ত্রধারী আনসার সদস্যরা হাসপাতালের প্রধান প্রবেশদ্বার, বহির্বিভাগ এবং জরুরি পয়েন্টগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল দেওয়া শুরু করার পর থেকেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। টিকিট কাউন্টার ও ওষুধ বিতরণের স্থানগুলোতে আনসার সদস্যরা সুশৃঙ্খল লাইন বজায় রাখায় চোরদের ভিড়ের সুযোগ নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হওয়ায় হাসপাতালের ভেতরে এখন এক ধরণের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি হয়েছে, যার ফলে চোর-পকেটমারদের আনাগোনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই তৎপরতায় সাময়িকভাবে স্বস্তি ফিরলেও, এই ধারা বজায় রাখতে সচেতন মহলের দাবি, হাসপাতালের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার আওতা বাড়িয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা। আনসার সদস্যদের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা। কোনো চোর আটক হলে তাকে ছাড় না দিয়ে সরাসরি শ্রীপুর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুজ্জামান লিটন বলেন, সরকারি এই সেবা কেন্দ্রে রোগীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো কোনো অপরাধ বরদাশত করা হবে না। সশ্লিষ্ট আনসার বাহিনীর নিয়মিত সতর্ক অবস্থানের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই হাসপাতালটি শতভাগ নিরাপদ ও আদর্শ সেবা কেন্দ্রে পরিণত হবে।