নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন ও উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। রাজনৈতিক অঙ্গনে বরাবরই সরগরম এই অঞ্চলে সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আমিরুল ইসলাম কালাম কিংবা প্রকৌশলী মো: ফজলুল আজিমের হাত ধরে শক্তিশালী রূপ পেয়েছিল মূলধারার রাজনীতি। পরবর্তীতে বিগত ১৭ বছরে ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজপথের তীব্র দমন-পীড়নের মাঝে বহু ত্যাগী নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়ে পড়েন, অনেকে পাড়ি জমান রাজধানীতে। ঠিক সেই সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী এবং মোহাম্মদ আলীর প্রশাসনিক ক্ষমতার নেপথ্যে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী অর্থনৈতিক বলয় গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ৫ই আগস্টের পরবর্তী পটপরিবর্তনের পরও থামেনি এই গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, বরং শত কোটি টাকার মূলধনে বলীয়ান হয়ে তারা এবার বিএনপির রাজনীতির প্রথম সারিতে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
হাতিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থানীয় প্রিন্স কামালের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনা—উভয়েই তার বাসভবনে অবস্থান করার ঘটনা রাজনীতির মাঠে অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। একসময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও পথপরিক্রমায় তিনি জাতীয় পার্টি হয়ে ১৯৮৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রীকে ‘স্বর্ণের নৌকা’ উপহার দিয়ে পুনরায় ক্ষমতাসীনদের সারিতে যোগ দেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দলটির রাজনীতিতেই সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তিনি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর সাথে সুদৃঢ় সম্পর্কের বলয় তৈরি করেন। এই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি তার ছেলে সাবেক হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি প্রিন্স রাশেদ, ভাগিনা রাহাত চৌধুরী ও সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাজ্জাদকে একরামুল চৌধুরীর হাতে তুলে দেন। তাদের সাথে যুক্ত হন একরামুল চৌধুরীর আরেক ঘনিষ্ঠ অনুসারী জাবেদ। চারজনের এই সমন্বিত অক্ষ নোয়াখালীর প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অঙ্গনে এক বিশাল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নোয়াখালী জেলার প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ সরকারি ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা করেছে এই চক্রটি। প্রতি বছর জেলা পর্যায়ে শীর্ষ করদাতার স্বীকৃতি পাওয়ার আড়ালে তারা পুরো অঞ্চলের ঠিকাদারি, বাজার ও হাউজিং খাতের একক নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়। তৎকালীন সময়ে শাসকদলের যেকোনো বড় ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসভা আয়োজন, এমনকি উচ্চপর্যায়ের কেন্দ্রীয় নেতাদের নোয়াখালী সফর ও আপ্যায়নের বিশাল ব্যয়ভার এই চক্রের পার্সেন্টেজের টাকা থেকেই নির্বাহ করা হতো। শুধু তাই নয়, প্রভাব খাটিয়ে নোয়াখালী হাউজিং প্রকল্প থেকে নিজেদের ও স্বজনদের নামে হাতিয়ে নেওয়া হয় সতেরোটি মূল্যবান প্লট। একই সাথে নোয়াখালী সুপার মার্কেটের জনপ্রিয় আলিফ রেস্টুরেন্ট এবং সুপার শপের বরাদ্দও চলে যায় এই সিন্ডিকেটের কব্জায়। রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বের ছায়াতলে এসে সাধারণ অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে অল্প সময়ে তারা শত শত কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তির মালিকে পরিণত হন।
গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পুরো দৃশ্যপট বদলে গেলেও এই চক্রের রূপ বদলানোর কৌশল থামেনি। কৌশলগত কারণে চক্রের অন্যতম সদস্য রাহাত চৌধুরী ঢাকায় আত্মগোপন করেন এবং জাবেদ শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ঢাকা ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে যাতায়াত বজায় রাখেন। অন্যদিকে অতীতের ছাত্রদলের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মাঠে নামেন প্রিন্স রাশেদ ও ভিপি সাজ্জাদ। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের জোরে নোয়াখালী জেলা ও হাতিয়া উপজেলা বিএনপির একটি সুবিধাবাদী অংশকে হাত করে তারা রাতারাতি নিজেদের মূলধারার রাজনীতির সামনে নিয়ে এসেছেন। যেসব তৃণমূল নেতাকর্মী হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বছরের পর বছর পরিবার ছেড়ে ঢাকায় দিনাতিপাত করেছেন, তাদের চোখ এড়িয়েই শাসকদলের ১৭ বছরের সুবিধাভোগীরা নতুন রাজনৈতিক পরিচয় কিনতে সক্ষম হচ্ছে।
তৃণমূলের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মী ও সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক এই অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে তারা ইতোমধ্যেই নথিপত্র ও প্রমাণাদি সংগ্রহ শুরু করেছেন। সুবিধাবাদী এই চক্রকে দল থেকে বয়কট করা না হলে সংগৃহীত সকল প্রামাণ্য দলিল সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। হাতিয়ার রাজনীতিকে কোনো নির্দিষ্ট সুবিধাবাদী চক্রের অর্থবিত্তের চারণভূমিতে পরিণত হতে না দেওয়ার জন্য এখন বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে জোর দাবি উঠছে।