গোপন দালিলিক কারসাজির মাধ্যমে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর ট্রাস্ট ডিডের বিধি-বিধান উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে প্রয়াত চিকিৎসক রবিউল হোসেনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ট্রাস্টের নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ না করে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে ট্রাস্ট পরিচালনা করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে স্বজনদের নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন।
ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী, সিইআইটিসি ট্রাস্টি বোর্ড ১১ সদস্যবিশিষ্ট হওয়ার কথা। এর মধ্যে বিএনএসবির আজীবন সদস্যদের মধ্য থেকে চারজন, জার্মানির প্রধান দাতা আন্দ্রে হেলফি থেকে তিনজন, একজন বেড ডোনার প্রতিনিধি, একজন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, যুক্তরাজ্যের রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটি ফর ব্লাইন্ড থেকে একজন এবং অস্ট্রেলিয়ার ফরসাইট থেকে একজন ট্রাস্টি মনোনয়নের বিধান রয়েছে। এছাড়া ট্রাস্ট দলিল অনুযায়ী, প্রধান দাতা আন্দ্রে হেলফি মনোনীত ট্রাস্টিদের মধ্য থেকেই প্রতি পাঁচ বছরের জন্য ম্যানেজিং ট্রাস্টি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে আন্দ্রে হেলফি তিনজন ট্রাস্টিকে মনোনয়ন দিলেও তাঁদের বৈধ মেয়াদ ২০০০ সালেই শেষ হয়ে যায়। এরপরও ট্রাস্ট ডিডের শর্ত উপেক্ষা করে দীর্ঘ প্রায় ২৬ বছর ডাঃ রবিউল হোসেন নিজেকে ম্যানেজিং ট্রাস্টি হিসেবে বহাল রাখেন, যা ট্রাস্ট দলিলের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করা হয়েছে।
ম্যানেজিং ট্রাস্টির দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বজনপ্রীতির অভিযোগও সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, বোর্ড অব ট্রাস্টির অনুমোদন ছাড়াই বড় ছেলে ডাঃ রাজীব হোসেনকে মাসিক প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বেতন, আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও হাসপাতালের সার্ভিস রুলস অনুযায়ী একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে চাকরি করতে পারেন না।
এছাড়া হাসপাতালের সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় কার্যক্রমও তাঁর নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ডাঃ রাজীব হোসেনের বিদেশি উচ্চতর ডিগ্রি ও অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ডাঃ রাজীব হোসেন ও তাঁর পিতার প্রশাসনিক আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে হাসপাতালের প্রতিষ্ঠালগ্নের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে পরবর্তীতে চট্টগ্রামে পৃথকভাবে শেভরন চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।
অন্যদিকে, ছোট ছেলে রিয়াজ হোসেনকেও ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই তাঁকে প্রথমে ডিরেক্টর-স্ট্র্যাটেজিক কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, পরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং সর্বশেষ হেড অব অপারেশনস পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এছাড়া ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রমও তাঁর নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, খুলশী থানায় দায়ের হওয়া ৮৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় দাখিল করা চার্জশিটে রিয়াজ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ কোটি টাকার সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণের উল্লেখ রয়েছে। ওই মামলায় তিনি কারাগারেও ছিলেন এবং মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গত প্রায় ২৭ বছরে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল ও ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই চক্ষু হাসপাতালের গেস্ট হাউস দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত আবাসন ও ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল স্টাফদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটও পরিবারের সদস্যদের দখলে ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া যোগ্যতার পরিবর্তে আত্মীয়স্বজনকে উচ্চ বেতনে নিয়োগ, ট্রাস্ট সদস্য মনোনয়নে স্বজনপ্রীতি, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া মাল্টিপারপাস ভবনের বাজেট বৃদ্ধি, নির্মাণ তদারকিতে অনিয়ম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবহার করার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ সরকারের অনুদান এবং রোগীদের সেবামূলক কার্যক্রম থেকে অর্জিত কোটি কোটি টাকা হাসপাতালের উন্নয়নের পরিবর্তে অপচয় ও অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এই ট্রাস্টের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের ওপর একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে সুশাসনের আওতায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।