বর্তমান সময়ে জীবন বীমা (Life Insurance) একটি বহুল প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থা। অনেকেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে জীবন বীমা করেন, আবার অনেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য জীবন বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— তার উপার্জন ও লেনদেন শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না। তাই জীবন বীমা ও জীবন বীমা কোম্পানিতে চাকরির শরয়ী বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে প্রচলিত অধিকাংশ Conventional Life Insurance সুদ (রিবা), অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (গারার) এবং জুয়াসদৃশ (মাইসির) উপাদানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে ইসলামী ফিকহবিদগণের অধিকাংশের মতে এ ধরনের জীবন বীমা করা এবং এতে সুদী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত চাকরি করা জায়েজ নয়।
কুরআনের আলোকে সুদের ভয়াবহতা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَمۡحَقُ ٱللَّهُ ٱلرِّبَوٰا وَيُرۡبِي ٱلصَّدَقَٰتِۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ
‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদাকাকে বৃদ্ধি করেন। আর আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৬)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَذَرُواْ مَا بَقِيَ مِنَ ٱلرِّبَوٰٓاْ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُواْ فَأۡذَنُواْ بِحَرۡبٖ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۖ وَإِن تُبۡتُمۡ فَلَكُمۡ رُءُوسُ أَمۡوَٰلِكُمۡ لَا تَظۡلِمُونَ وَلَا تُظۡلَمُونَ
‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হয়ে থাক, তবে সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর। আর যদি তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ কর। আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদের প্রাপ্য। তোমরা কারও প্রতি জুলুম করবে না এবং তোমাদের প্রতিও জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৮–২৭৯)
হাদিসে সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কঠোর সতর্কতা
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
হজরত জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীর ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন—তারা সবাই সমান (গুনাহের অংশীদার)।’ (মুসলিম ১৫৯৮, আবু দাউদ ৩৩৩৩, তিরমিজি ১২০৬, নাসাঈ ৫১০৮, ইবনে মাজাহ ২২৭৭)
জীবন বীমার শরয়ী বিধান
বাংলাদেশে প্রচলিত (Conventional) জীবন বীমা সম্পূর্ণরূপে সুদভিত্তিক বিনিয়োগ ও লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি এতে গারার (অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা) এবং মাইসির (জুয়াসদৃশ লেনদেন)-এর উপাদানও বিদ্যমান। তাই ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের জীবন বীমা করা জায়েজ নয়।
একইভাবে জীবন বীমা কোম্পানির এমন চাকরি, যা সুদী কার্যক্রম পরিচালনা, হিসাবরক্ষণ, দলিল প্রণয়ন, বিপণন বা অন্যান্যভাবে সুদী লেনদেনে সহযোগিতা করে, তাও জায়েজ নয়।
ফকীহদের বক্তব্য
ومن هنا ظهر أن التوظف فى البنوك الربوية لا يجوز، فإن كان عمل الموظف فى البنك ما يعين على الربا، كالكتابة، أو الحساب، فذلك حرام لوجهين، الأول: إعانة على المعصية، والثانى: أخذ الأجرة من المال الحرام.
‘এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, সুদভিত্তিক (রিবা-নির্ভর) ব্যাংকে চাকরি করা বৈধ নয়। বিশেষত যদি কর্মচারীর কাজ সুদের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে—যেমন সুদের লেনদেন লিখে রাখা, হিসাব-নিকাশ করা ইত্যাদি—তবে তা দুটি কারণে হারাম। প্রথমত, এটি পাপের কাজে সহযোগিতা করা; দ্বিতীয়ত, হারাম উপার্জন থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা।’ (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, কিতাবুল মুসাকাত ওয়াল মুযারাআহ, বাব: লা’নু আকিলির রিবা ওয়া মুওকিলিহি, আশরাফিয়া, ১/৬১৯)
যেহেতু বাংলাদেশের প্রচলিত জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমও মূলত সুদভিত্তিক বিনিয়োগ ও লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই উক্ত ফিকহি নীতির আলোকে সেখানে সুদী কার্যক্রমে সহযোগিতামূলক চাকরিও একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত বলে সমকালীন বহু আলেম মত প্রকাশ করেছেন।
ইসলামী বিকল্প: তাকাফুল (Takaful)
তাকাফুল (تكافل) একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ—
ইসলামী অর্থনীতিতে তাকাফুল বলতে এমন একটি শরিয়াহসম্মত বীমা ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা একটি সাধারণ তহবিলে অর্থ প্রদান করেন এবং কোনো সদস্য ক্ষতির সম্মুখীন হলে সেই তহবিল থেকে তাকে সহায়তা করা হয়। এখানে মূল উদ্দেশ্য ব্যবসায়িক মুনাফা নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা (تعاون) এবং ঝুঁকি ভাগাভাগি (Risk Sharing)।
প্রচলিত বীমা ও তাকাফুলের পার্থক্য
একজন মুসলিমের জন্য হালাল উপার্জন ও শরিয়তসম্মত আর্থিক লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও সুন্নাহ সুদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী প্রদান করেছে এবং সুদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতাকেও গুরুতর গুনাহ হিসেবে গণ্য করেছে। এ কারণে বাংলাদেশে প্রচলিত সুদভিত্তিক জীবন বীমা করা এবং সে ধরনের প্রতিষ্ঠানে সুদী কার্যক্রমে সহযোগিতামূলক চাকরি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
তবে শরিয়াহসম্মত তাকাফুল ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে তা গ্রহণ করা যেতে পারে, কারণ এর ভিত্তি পারস্পরিক সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও ইসলামী আর্থিক নীতিমালা।