• মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ন

রাতে শিক্ষকের সঙ্গে ভিডিও কল, ভোরে মেলে মিমোর ঝুলন্ত মরদেহ

Reporter Name / ৫ Time View
Update : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

গভীর রাতে ভিডিও কলে আলাপ, এর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভোরে মেলে ঝুলন্ত মরদেহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর (২৬) এমন মৃত্যু ঘিরে পরিবারের অভিযোগ, ওই কথোপকথনে তাকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে তার এক শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলায় তিনি এক নম্বর আসামি। বর্তমানে তার ঠাঁই হয়েছে কারাগারে।

পুলিশ বলছে, রাজধানীর বাড্ডা থানার উত্তর বাড্ডায় মিমোদের বাসায় আলোচিত এ ঘটনার সময় শনিবার (২৫ এপ্রিল) গভীর রাত থেকে রোববার (২৬ এপ্রিল) ভোরের মধ্যে যা ঘটেছে, সেটিই এখন খুঁটিয়ে দেখছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ডিজিটাল আলামত, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ঘটনাক্রম- সব মিলিয়ে মামলাটির তদন্ত চলছে।

নিহত মিমো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার ড. সুদীপ চক্রবর্তী একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

মামলার নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসায় নিজের কক্ষে যান শিক্ষার্থী মিমো। এরপর রাত আনুমানিক ১টার দিকে তার সঙ্গে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর ভিডিও কলে কথা হয়। এই কলকেই এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকা মিমোর সঙ্গে ‘শেষ যোগাযোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশ্লেষণ করছে তদন্ত দল।

পরদিন ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে নামাজের জন্য ডাকতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা তার কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পান। একাধিকবার ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, তিনি ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় আছেন। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা মিলে তাকে নামালেও ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

খবর পেয়ে বাড্ডা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রস্তুত করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কাজী ইকবাল হোসেন তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মৃত্যুর প্রকৃতি নির্ধারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অভিযুক্তের সঙ্গে সম্পর্ক ও প্ররোচনা

ভুক্তভোগীর পরিবারের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে মিমোর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ঘটনার রাতে তাদের মধ্যে ভিডিও কলে কথোপকথনের পর মিমো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ওই আলাপের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি আত্মহত্যা করেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, মিমোর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ও কল রেকর্ডে দুজনের সম্পর্ক এবং যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গোপন সংবাদের সূত্রে গ্রেফতার

তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আসামিকে হাজির করে জেলহাজতে আটক রাখার আবেদনে জানান, এজাহারের ভিত্তিতে আসামিকে শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো হয়। রোববার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উত্তর বাড্ডার উদয় ম্যানসন লেন এলাকা থেকে সুদীপ চক্রবর্তীকে আটক করা হয়। পরে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।

গ্রেফতারের পর আসামিকে থানায় এনে বিধি মোতাবেক সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তে ডিজিটাল আলামতে জোর

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, কল ডেটা রেকর্ড ও সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি- সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। এই মামলায় শেষ ভিডিও কল শুধু একটি যোগাযোগ নয়, সম্ভাব্য প্ররোচনার সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাড্ডা থানার এসআই ইকবাল হোসেন বলেন, এটি একটি ডিজিটাল ট্রেইলনির্ভর মামলা হয়ে উঠছে। কল লগ, মেসেজ, ভিডিও কলের সময়কাল, সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আসামির সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা প্রমাণে আরও গভীর ফরেনসিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

আসামির দেওয়া নাম-ঠিকানা যাচাই প্রক্রিয়াধীন বলেও তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানিয়েছেন। তিনি আদালতে দাখিল করা আবেদনে বলেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন। এছাড়া তদন্তের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় অভিযোগ

মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারায় (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) দোষী সাব্যস্ত করতে হলে কেবল সম্পর্ক বা কথোপকথন নয়, প্ররোচনার সরাসরি বা পরোক্ষ প্রমাণ দেখাতে হয়।

আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব  বলেন, প্ররোচনা বলতে এমন আচরণ বোঝায়, যা ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। সেটি প্রমাণে ধারাবাহিক মানসিক চাপ, হুমকি বা প্রভাবের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডিজিটাল কনটেন্ট এখানে প্রধান প্রমাণ হতে পারে।

 

অভিযুক্ত শিক্ষক কারাগারে

মিমোর মৃত্যু ঘিরে এই আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় অভিযুক্ত সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৭ এপ্রিল) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রিপন হোসেন এ আদেশ দেন।

এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইকবাল হোসেন আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান। তবে এদিন অভিযুক্ত আসামিকে বিচারকের এজলাসে তোলা হয়নি। শুনানি শেষে তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীর বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে সুদীপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপরই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ যা বলছে

ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন  বলেন, মামলাটি সংবেদনশীল এবং প্রমাণনির্ভর। এখানে ডিজিটাল যোগাযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত তদন্তের অগ্রগতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তিনি জানান, ঘটনার সত্যতা উদঘাটনের জন্য পরে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনও করা হবে। কারণ তিনি মামলাটির এক নম্বর আসামি। তার সঙ্গে কথা হওয়ার পরই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category