• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন

গৌতম বুদ্ধের মহাযাত্রা: রাজকুমার থেকে বোধিলাভ

ডেস্ক রিপোর্ট / ১৮ Time View
Update : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

প্রকৃত সত্যকে জানতে এবং মানবের মুক্তির পথ খুঁজতে রাজৈশ্বর্য, ভোগবিলাস ও আরাম-আয়েশের সকল আয়োজনে পরিপূর্ণ রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন এক রাজকুমার, হয়েছিলেন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী।

মানবের মুক্তিপথের সন্ধানী এই রাজকুমার হলেন শাক্যরাজ্যের রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম, যিনি পরবর্তীকালে সারা বিশ্বে ‘গৌতম বুদ্ধ’ নামে পরিচিত হন।

গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে কপিলবস্তু ও দেবদহ নগরের মধ্যবর্তী স্থানে লুম্বিনী নামে একটি সুবৃহৎ উদ্যানে মহাশালবৃক্ষতলে।

রাজকীয় সুখ ও ঐশ্বর্যের মধ্যেই কাটছিল রাজকুমার গৌতমের দিন। প্রাসাদের আনন্দ ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনের বাইরে বহির্জগত সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না।

একদিন গৌতমের ইচ্ছে হলো নগর পরিভ্রমণে যাবেন। নগর পরিভ্রমণে বের হয়ে প্রথম দিন তিনি এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধকে দেখেন, দ্বিতীয় দিন ব্যাধিগ্রস্ত যন্ত্রণাকাতর এক ব্যক্তিকে দেখেন, তৃতীয় দিন এক মৃত ব্যক্তিকে দেখেন।

বাস্তব জগতের এই রূঢ়, নির্মম সত্যগুলো তাঁর ধারণার বাইরে ছিল। জরা, ব্যাধি, মৃত্যুকে দর্শন করে গৌতম উপলব্ধি করেন জীবন নশ্বর ও দুঃখময়। জরা এসে রূপ-যৌবন কেড়ে নেবে, ব্যাধি এসে স্বাস্থ্য নষ্ট করে দেবে, মৃত্যু এসে জীবনকে গ্রাস করে নেবে।

প্রাসাদের যাবতীয় ভোগবিলাস ও আমোদ-প্রমোদ তাঁর কাছে অতি তুচ্ছ মনে হতে থাকে। অত্যন্ত বিচলিত ও চিন্তাক্লিষ্ট গৌতম দিনরাত ভেবে চলেছেন এসকল দুঃখ থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায় কী?

নগর পরিভ্রমণের চতুর্থ দিনে তিনি গেরুয়া পরিহিত এক শান্তচিত্ত ধীরস্থির সন্ন্যাসীকে দেখতে পেলেন। গৌতম স্থির করে ফেললেন আর কালবিলম্ব না করে এই সন্ন্যাসীর মতো মুক্তির পথে বেরিয়ে পড়তে হবে।

যে পথে মানবের দুঃখের প্রকৃত নিবৃত্তি হবে সে পথের অন্বেষণে মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে সংসারের সকল বন্ধন ছিন্ন করে চিরকালের জন্য গৃহত্যাগ করেন গৌতম। দীর্ঘ ছয় বছর অবিরাম সাধনায় খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বুদ্ধগয়ায় বোধিবৃক্ষের নিচে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম দুঃখমুক্তির পূর্ণজ্ঞান লাভ করেন।

তিনি ‘চারি আর্যসত্য’ উপলব্ধি করেন, দুঃখমুক্তির উপায় ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ ও ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’ তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। গৌতম যে পূর্ণজ্ঞান লাভ করেন তার নাম সম্বোধি। সম্বোধি লাভ করার পর তাঁর নাম হয় ‘বুদ্ধ’ অর্থাৎ জ্ঞানী এবং জগতে তিনি ‘বুদ্ধ’ নামে খ্যাত হন।

বুদ্ধ যে সত্যের সন্ধান পান তা হলো ‘চারি আর্যসত্য’। এই চারটি সত্য হলো দুঃখ, দুঃখ সমুদয়, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধ মার্গ। জ্ঞানের পবিত্র আলোকে গৌতম দেখলেন এ জগৎ জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অধীন।

জন্ম হলে রোগ, শোক, নৈরাশ্য, জরা, মৃত্যু ইত্যাদি দুঃখ ভোগ করতে হবেই। জন্মই এসকল দুঃখের মূল। আবার জন্মের কারণ হলো তৃষ্ণা। তৃষ্ণা হতেই দুঃখের উৎপত্তি হয়ে থাকে। তৃষ্ণা অবিদ্যামূলক। অবিদ্যা দূর হলে বা তৃষ্ণার ক্ষয় সাধন হলে জন্মগতি রোধ হয়। সেই জন্মরোধই নির্বাণ যা দুঃখমুক্তির একমাত্র উপায়। এভাবে তৃষ্ণার নিরোধে দুঃখের নিরোধ ঘটে।

দীর্ঘ সাধনায় বুদ্ধ যে মহাসত্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন সেই মহাসত্যের অমোঘবাণীতে ছিল অহিংসার বীজমন্ত্র, সাম্য ও মহামৈত্রীর আহ্বান এবং জাগতিক দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়। বিশ্বমানবতার কল্যাণে ভারতবর্ষের দিকে দিকে মহাসত্যের অমোঘবাণী ছড়িয়ে দিতে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নানান স্থানে পরিভ্রমণ করেছেন।

বুদ্ধের অমিয় সুধামিশ্রিত বাণী শ্রবণ করে অগণিত রাজা, মহারাজা, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সমাজের উঁচু-নিচু সকল শ্রেণির মানুষ সেই ধর্মের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিলেন, এমনকি সমাজে যারা ঘৃণিত ছিল তারাও আশ্রয় পেলেন সেই ধর্মের ছায়াতলে। সকলে শ্রবণ করলেন শান্তির বাণী, মুক্তির বাণী।

বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই তাঁর খ্যাতি তাঁর বিচরণ ক্ষেত্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি অনীশ্বরবাদী ছিলেন। কোনো ঈশ্বর বা দিব্যশক্তির ওপর বিশ্বাস করতেন না, কোনো অতীন্দ্রিয় বস্তুর দ্বারা জগতের কল্যাণও আশা করতেন না। তিনি সর্বতোভাবে নির্ভর করেছেন আত্মশক্তির ওপর, নিজের সাধনার ওপর, আত্মোপলব্ধির ওপর।

তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্তা। তিনি এমন এক ধর্ম প্রবর্তন করেন যে ধর্মে মানুষের মুক্তি কোনো ঐশ্বরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, এই ধর্ম বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও যাগযজ্ঞের পরিবর্তে প্রজ্ঞার সাধনায় অন্তরে বিরাজমান সব কলুষতা, লোভ, মোহ, হিংসা, দ্বেষ ইত্যাদি দমন করে প্রেম, ধর্ম, সত্য ও ত্যাগের মাধ্যমে মুক্তির পথ নির্দেশ করে।

বুদ্ধ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষে বুদ্ধদেব মানবকে বড় করিয়াছিলেন। তিনি জাতি মানেন নাই, যাগযজ্ঞের অবলম্বন হইতে মানুষকে মুক্তি দিয়াছিলেন, দেবতাকে মানুষের লক্ষ্য হইতে অপসৃত করিয়াছিলেন। তিনি মানুষের আত্মশক্তি প্রচার করিয়াছিলেন। দয়া এবং কল্যাণ তিনি স্বর্গ হইতে প্রার্থনা করেন নাই, মানুষের অন্তর হইতে তাহা তিনি আহ্বান করিয়াছিলেন।’

রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মানব’ বলে। শুধু রবীন্দ্রনাথই নন, আধুনিক যুগের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক মনীষী বুদ্ধকে এই মাটির বুকে জন্মগ্রহণকারী শ্রেষ্ঠ মানব বলে অভিহিত করেছেন।

বুদ্ধ ছিলেন প্রেম ও করুণার অবতার। প্রাণীমাত্রেই ছিল তাঁর দয়া ও প্রেম। তিনি হিংসার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। ঘৃণা ও ক্রোধের পরিবর্তে প্রেম ও মৈত্রীর দ্বারা জয়ের কথা বলতেন। অহিংসাকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে প্রসারিত করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অহিংসার প্রচার চালিয়েছেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে আশি বছর বয়সে হিরণ্যবতী নদীর তীরে কুশীনগরের উপবর্তনে মল্লদের শালবনে যমক শালবৃক্ষের তলায় বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে রাতের শেষ প্রহরে মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। প্রেম-করুণার মূর্ত প্রতীক বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর আড়াই হাজার বছর কেটে গেছে।

কিন্তু তাঁর আদর্শ ও অতুলনীয় জীবনদর্শন আজও প্রাসঙ্গিক ও বিশ্বের আপামর মানুষের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণপ্রদ। হিংসা, যুদ্ধবিগ্রহ ও অস্থিরতায় জর্জরিত বর্তমান বিশ্বে মানুষের আত্মোপলব্ধি ও মুক্তির দিশারি বুদ্ধের অহিংসা, করুণা এবং মৈত্রীর বাণীই একমাত্র শান্তির পথ দেখাতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category