• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৩:২৪ পূর্বাহ্ন

খান জাহান আলী জামে মসজিদ: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১২ Time View
Update : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

দক্ষিণ বাংলার নিসর্গে, যেখানে নদী আর অরণ্য একে অন্যের কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ইতিহাসও যেন নিঃশব্দে শ্বাস নেয়। সুন্দরবনের গাঢ় সবুজের ভেতর, কালের ধুলো মেখে দাঁড়িয়ে আছে খান জাহান আলীর (রহ.) স্থাপত্য-ঐতিহ্য। এই নিদর্শনগুলো শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এগুলো এক যুগের স্বপ্ন এবং বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এক অপূর্ব সাক্ষ্য। অথচ সময়, অবহেলা আর প্রকৃতির আগ্রাসনে বহুবার এগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রশাসক আর. সি. স্ট্রার্ণডেল যখন এ অঞ্চলের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুন্দরবন পরিদর্শনে আসেন, তখন তিনি এই স্থাপনাগুলোর করুণ অবস্থা দেখে বিস্মিত হন। তার বিবরণে উঠে আসে এক ধ্বংসপ্রায় অতীতের ছবি। তিনি লিখেছিলেন, প্রাচীরবেষ্টিত তিনটি ইমারতই অযত্ন আর আগাছার দখলে চলে গেছে। বটগাছের বিশাল শিকড় ইটের গাঁথুনির ভেতর ঢুকে দেওয়ালগুলোকে ক্ষয়ে দিচ্ছে, বুরুজ ও গম্বুজের গায়ে ফাটল ধরাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে মানুষ-নির্মিত এই ইতিহাসকে নিজের ভেতরে টেনে নিতে চাইছে।

প্রাচীরবেষ্টিত যে দুটি স্থাপনা বিশেষভাবে দর্শকের দৃষ্টি কাড়ে, তা হলো খান জাহান আলীর কবর এবং তার সংলগ্ন মসজিদ। স্থাপত্যের ভাষায় এগুলো বাংলার মধ্যযুগীয় মুসলিম শিল্পরীতির এক অনন্য নিদর্শন। কবরটি যেমন গাম্ভীর্যে ভরা, মসজিদটিও তেমনি সংযমী সৌন্দর্যে দীপ্ত।

মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকৃতির। কবর থেকে পৃথকভাবে এটি নির্মিত হয়েছে। মাঝখানে একটি স্বল্প-উঁচু প্রাচীর দিয়ে মাজার ও মসজিদকে আলাদা করা হয়েছে। এই বিভাজন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য এবং ব্যবহারিক প্রয়োজন—দুইয়েরই প্রতিফলন। কবর পবিত্র স্মৃতির স্থান, আর মসজিদ ইবাদতের। দুটি পাশাপাশি থেকেও নিজস্ব মর্যাদা বজায় রেখেছে।

মসজিদের চার কোণায় রয়েছে গোলাকার বুরুজ। এগুলো ছাদ পর্যন্ত উঠে গিয়ে শেষ হয়েছে। বুরুজের মাথায় খাঁজকাটা নিরেট কিউপলা, যার চূড়া কলসাকৃতির। বাংলার সুলতানি স্থাপত্যে এই ধরনের অলংকরণ প্রায়ই দেখা যায়। বুরুজগুলো সমান্তরালভাবে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত, যা স্থাপনাটিকে দিয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সময়ের প্রহরী হয়ে চারটি বুরুজ এখনো পাহারা দিচ্ছে সেই পুরোনো দিনের ইতিহাসকে।

মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের একটি হলো এর বক্রাকার কার্নিশ। বাংলার প্রাচীন স্থাপত্যে এ ধরনের কার্নিশ ছিল জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য এক অনন্য উদ্ভাবন। বর্ষার পানি যাতে সহজে গড়িয়ে পড়ে, সে কারণেই এ রকম বক্রাকার কার্নিশ বানানো হতো। কিন্তু কার্যকারিতার সঙ্গে সঙ্গে এটি স্থাপনাকে দিয়েছে নান্দনিক কোমলতা। দুই স্তরবিশিষ্ট মোল্ডিং মসজিদের গায়ে এমনভাবে বসানো হয়েছে যে, তা আলো-ছায়ার খেলায় এক ভিন্ন আবহ তৈরি করে।

মসজিদটি ড্রামবিহীন এক গম্বুজ দ্বারা আবৃত। সাধারণত অনেক গম্বুজের নিচে উঁচু ড্রাম বা ভিত্তি দেখা যায়, কিন্তু এখানে গম্বুজটি সরাসরি মূল কাঠামোর ওপর স্থাপিত। এতে নির্মাণশৈলীতে এসেছে এক ধরনের সংহতি। প্রায় ৩৬ ফুট উঁচু এই গম্বুজ স্কুইঞ্চের সাহায্যে নির্মিত। অর্থাৎ বর্গাকার কক্ষের চার কোণ থেকে বিশেষ কৌশলে গম্বুজকে উপরে তোলা হয়েছে। মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যে এটি ছিল এক অনন্য প্রকৌশল কৌশল।

ধারণা করা হয়, এই মসজিদ মূলত তীর্থযাত্রী ও জিয়ারতকারীদের ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছিল। খান জাহান আলীর মাজারে আগত মানুষ যেন নামাজ আদায় ও ইবাদতের সুযোগ পান, সে উদ্দেশ্যেই এর নির্মাণ।

মসজিদটি আকারে বড় না হলেও এর ভেতরে রয়েছে এক অন্তর্মুখী প্রশান্তি। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে মাত্র একটি অবতল মিহরাব। এই মিহরাবের অলংকরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিবলামুখী এই অংশে দিল্লির বিখ্যাত ‘আলাই দরওয়াজা’র অনুকরণে ফলকাকৃতির নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, বাংলার স্থপতিরা শুধু স্থানীয় শিল্পরীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তারা দিল্লির সমসাময়িক মুসলিম স্থাপত্য দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন।

মসজিদে প্রবেশের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দিকে খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে। সম্মুখভাগে তিনটি খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথ নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যবর্তী খিলানটি তুলনামূলক বড়। এই বড় খিলানটি যেন দর্শনার্থীকে আহ্বান জানায়—এসো, ইতিহাসের ভেতরে প্রবেশ করো। খিলানের ভেতর দিয়ে আলো ঢুকে যখন মেঝেতে পড়ে, তখন মনে হয় শতাব্দীর পুরোনো নীরবতা আজও সেখানে জমে আছে।

দুঃখের বিষয়, এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দীর্ঘদিন প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের বাইরে ছিল। ফলে এর মৌলিক রূপ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আধুনিক সংস্কারের নামে কোথাও রঙের প্রলেপ, কোথাও মার্বেলের ব্যবহার—এসব স্থাপনাটির প্রাচীন সৌন্দর্যকে ম্লান করেছে। যে দেয়াল একসময় পোড়ামাটির ইটের গাঢ় লাল রঙে ইতিহাসের কথা বলত, আজ সেখানে চকচকে রঙের আস্তরণ বেমানান লাগে।

এটা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে অবহেলার একটা উদাহরণ। আমরা সংরক্ষণ করতে গিয়ে ইতিহাসের আত্মাই মুছে ফেলি। একটি প্রাচীন স্থাপনার সৌন্দর্য তার বয়সে, তার ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালে, তার সময়ের দাগে। সেখানে আধুনিকতার চটক বসিয়ে দিলে স্থাপনাটি হয়তো নতুন দেখায়, কিন্তু হারিয়ে ফেলে তার আসল ভাষা।

খান জাহান আলীর মাজার ও সংলগ্ন মসজিদ কেবল ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক স্থান নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। এই স্থাপনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, বাংলার মাটিতে একসময় কী অসাধারণ স্থাপত্যচর্চা ছিল। নদী, বন আর জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে উঠেছিল নিজস্ব এক মুসলিম স্থাপত্যধারা।

আজ যখন আধুনিকতার চাপে পুরোনো নিদর্শনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তখন খান জাহান আলীর এই স্থাপনাগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ইটের ভাঁজেও বেঁচে থাকে। সেই ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা, সংবেদনশীলতা এবং প্রকৃত সংরক্ষণবোধ।

সুন্দরবনের নিস্তব্ধ বাতাসে দাঁড়িয়ে আজও যেন শোনা যায় অতীতের পায়ের শব্দ। বটগাছের শিকড়, ক্ষয়ে যাওয়া ইট, খিলানের ছায়া—সবকিছু মিলিয়ে খান জাহানের এই স্থাপনাগুলো এক গভীর সময়বোধের জন্ম দেয়। সেখানে গেলে মনে হয়, মানুষ মরে যায়, সাম্রাজ্য বিলীন হয়, কিন্তু কিছু সৃষ্টি দাঁড়িয়ে থাকে—নীরবে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category