• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

নতুন গিলাফে সজ্জিত পবিত্র কাবা

সবুজ বার্তা ডেস্ক / ৯ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

নতুন হিজরি বছরের শুরুতেই পবিত্র কাবা শরীফে পরানো হয়েছে নতুন গিলাফ। প্রতি বছরের মতো এবারও এক রাজকীয় ও মর্যাদাপূর্ণ আবহে এই বার্ষিক কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে, যা শত শত বছর ধরে চলে আসা ইসলামি ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী বিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ এবং কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সের একদল বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সৌদি কারিগর এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। শুরুতে গিলাফে থাকা সোনার প্রলেপযুক্ত ও রুপার তৈরি বিভিন্ন ক্যালিগ্রাফি, নকশা, লণ্ঠন আকৃতির অলঙ্করণ এবং কাবা শরীফের দরজার পর্দাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খুলে ফেলা হয়। এরপর পুরনো গিলাফটি নামিয়ে কমপ্লেক্স থেকে আনা নতুন গিলাফটি নিখুঁতভাবে পরানোর কাজ শুরু হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ মান ও নিখুঁত সুরক্ষা নিশ্চিত করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে।

কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তন শুধু একটি কাপড় বদলে ফেলার সাধারণ কোনো প্রক্রিয়া নয়। এটি মূলত বছরের পর বছর ধরে চলা দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সের কারিগরদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। আল্লাহর ঘরের মর্যাদার সঙ্গে সংগতি রেখে এখানকার প্রতিটি অংশ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়।

এই অনন্য শিল্পকর্মটি তৈরিতে বিপুল পরিমাণ উচ্চমানের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৮২৫ কেজি খাঁটি প্রাকৃতিক সিল্ক, যা গিলাফের বাইরের অংশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বাইরের মূল অবয়বের জন্য ৪৭ থান কালো সিল্ক এবং ভেতরের লাইনিং বা আস্তরের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ৪০০ কেজি খাঁটি তুলা।

গিলাফের মূল আকর্ষণ হলো এর সোনা ও রুপার জমকালো ক্যালিগ্রাফি। অত্যন্ত সুক্ষ্ম এমব্রয়ডারির কাজের জন্য এতে প্রায় ৬০ কেজি খাঁটি রুপা ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপশি পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং অন্যান্য নকশা ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে ১২ কেজি সোনা জড়ানো রুপার সুতো।

তবে এই কাঁচামালগুলো গিলাফে রূপ নেওয়ার আগে কমপ্লেক্সের বিশেষ পরীক্ষাগারে দীর্ঘ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। জলবায়ুর বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও আবহাওয়ার পরিবর্তন সহ্য করে এই গিলাফ যেন পুরো এক বছর মান ধরে রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই সিল্কের সুতো ও কাপড়ের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষাগারে উত্তীর্ণ হওয়ার পর কাপড়টিকে একটি জীবন্ত ক্যানভাসে রূপ দেওয়া হয়। কাপড়ের ওপর প্রথমে কোরআনের আয়াত ও ইসলামিক নকশার আউটলাইন বা স্কেচ আঁকা হয়। এরপর শুরু হয় সবচেয়ে সুক্ষ্ম ও ধৈর্যের কাজ—এমব্রয়ডারি। অত্যন্ত দক্ষ সৌদি কারিগরেরা গভীর মনোযোগ ও ধৈর্যের সঙ্গে সোনা ও রুপার সুতো দিয়ে এই নকশাগুলো ফুটিয়ে তোলেন।

মেশিনের পাশাপাশি এই গিলাফ তৈরিতে বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের ছোঁয়াও রয়েছে। কিছু বিশেষ অংশ ও জটিল নকশা শুধুমাত্র অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতেই বোনা হয়, যা গিলাফের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত রূপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। সব কটি অংশ আলাদাভাবে তৈরির পর শুরু হয় চূড়ান্ত সংযোজন বা জোড়া দেওয়ার কাজ। পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পর গিলাফটি কঠোর নিরাপত্তায় মসজিদুল হারামে নিয়ে আসা হয়।

আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এই গিলাফ তৈরির প্রক্রিয়াটি মোট সাতটি ধাপে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলো হলো— সুতো রাঙানো বা ডাইং, মেশিনে কাপড় বোনা, ল্যাব টেস্ট, প্রিন্টিং বা ক্যানভাস প্রস্তুত, এমব্রয়ডারি, হাতে কাপড় বোনা এবং চূড়ান্ত সংযোজন।

বিগত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরব অত্যন্ত ভক্তি ও যত্নের সঙ্গে পবিত্র দুই মসজিদের খেদমত হিসেবে কাবা শরিফের এই গিলাফ পরিবর্তনের কাজটি করে আসছে। প্রতি বছর হিজরি নববর্ষের শুরুতে কাবার গিলাফ পরিবর্তনের এই মহিমান্বিত দৃশ্য দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন, যা মুসলিম উম্মাহর গভীর আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category