বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ-সবকিছুই আজ একশ্রেণির অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীর মর্জির ওপর জিম্মি। সাধারণ মানুষ যখন আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি মেলাতে না পেরে ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই গুটিকয়েক অসাধু চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই ধর্মকে শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করেন। কিন্তু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই, যার সুন্দর ও সুষম সমাধান ইসলামে দেওয়া হয়নি। বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা অধিকার রক্ষা এবং অসাধু চক্রের দমন সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট।
কুরআনের হুঁশিয়ারি
ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো সততা, স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণ। ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইসলামে হলাল এবং অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে তা হতে হবে শোষণমুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা অবৈধ উপায়ে মানুষের সম্পদ গ্রাস করতে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে বলেন : ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।’
সিন্ডিকেট বা অসাধুচক্র মূলত এ ‘অন্যায়’ পন্থাই অবলম্বন করে। তারা পণ্য বাজারে না ছেড়ে আটকে রাখে, ফলে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হয় এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। মানুষের এ বাধ্যবাধকতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করে, তাদের উপার্জনকে পবিত্র কুরআন ‘বাতিল’ বা অবৈধ ঘোষণা করেছে।
তা ছাড়া সূরা আল-হুমাজাহতে আল্লাহতায়ালা সেসব অর্থলোভীদের কঠোর শাস্তির কথা বলেছেন, যারা শুধু সম্পদ জমা করে এবং তা গণনা করে রাখে, আর মনে করে এ সম্পদ তাকে অমর করে রাখবে। মজুতদারদের মানসিকতাও ঠিক এমন-তারা মানুষের কষ্টের বিনিময়ে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়তে চায়।
মজুতদারির শাস্তি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস পাঠ করলে দেখা যায়, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের দমনে তিনি কতটা কঠোর ছিলেন। ইসলামি পরিভাষায় পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাকে ‘এহতিকার’ বলা হয়। হাদিস শরিফে মজুতদারকে সরাসরি ‘অপরাধী’ ও ‘অভিশপ্ত’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য মজুত করে (কৃত্রিম সংকট তৈরি করে), আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্য দ্বারা আঘাত করেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৫৫)।
অন্য একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়েও ভয়ংকর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন : ‘যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে চল্লিশ দিন খাদ্যশস্য মজুত করে রাখল, সে আল্লাহর দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে গেল এবং আল্লাহও তার থেকে দ্বায়িত্বমুক্ত হয়ে গেলেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, সিন্ডিকেট করা বা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো শুধু একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি একটি বড় ধরনের সামাজিক অপরাধ (Crime against humanity)। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর মজুতদার অভিশপ্ত হয়।’ (ইবনে মাজাহ)। অর্থাৎ, যিনি পণ্য বাজারে সরবরাহ সচল রাখেন, তার রিজিকে আল্লাহ বরকত দেন। আর যে আটকে রাখে, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
মদিনার বাজার ও খলিফাদের তদারকি
ইসলামী ইতিহাসে শুধু তত্ত্বীয় আলোচনা নয়, বরং বাজারব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগ ও কঠোর তদারকির বাস্তব দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর নিজেই মদিনার বাজার তদারকি করতেন। তিনি বাজারে গিয়ে পণ্যের গুণগত মান এবং দামের খোঁজ নিতেন।
একবারের একটি বিখ্যাত ঘটনা হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বাজারের একটি খাদ্যশস্যের স্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তূপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং দেখলেন ভেতরের শস্যগুলো ভেজা। তিনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কী?’ বিক্রেতা উত্তর দিল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল।’ তখন রাসূল (সা.) বললেন : ‘তাহলে তুমি ভেজা অংশটা ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত? যে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)।
খলিফাতুল মুসলিমীন হজরত ওমর (রা.)-এর আমলে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিভাগ ছিল। তিনি নিজে চাবুক হাতে বাজারে টহল দিতেন। কোনো ব্যবসায়ী পণ্য মজুত করছে বা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে জানতে পারলে তিনি কঠোর শাস্তি দিতেন। হজরত ওমর (রা.) পরিষ্কার ঘোষণা করেছিলেন : ‘আমাদের বাজারে যেন কোনো মজুতদারি না হয়। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে তারা যেন বাইরে থেকে পণ্য এনে বাজারে সস্তা দরে বিক্রি করে। আর যে ব্যক্তি রমজান বা অন্য সময়ে উটের পিঠে করে পণ্য এনে আমাদের বাজারে কৃত্রিম সংকটের উদ্দেশ্যে মজুত করবে, ওমরের চাবুক তার পিঠে পড়বে।’
তিনি বাজার থেকে পণ্য বাজেয়াপ্ত করে সাধারণ মানুষের মাঝে ন্যায্যমূল্যে বিতরণ করার নজিরও স্থাপন করেছিলেন। এমনকি খলিফা আলী (রা.)-এর আমলও মজুতদারদের গুদাম ভেঙে শস্য বাজারে ছেড়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
আমাদের করণীয়
আজকের বাংলাদেশের বা বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির দিকে তাকালে ইসলামি অর্থনীতির এ নির্দেশনার প্রাসঙ্গিকতা প্রতিটি পদক্ষেপে টের পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে সিন্ডিকেট বা অসাধুচক্র কয়েকটি উপায়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে : এক. কৃত্রিম সংকট : হিমাগার বা গুদামে টন কে টন আলু, পেঁয়াজ, তেল বা চিনি লুকিয়ে রেখে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া। দুই. মিথ্যা প্রোপাগান্ডা : পণ্য সংকটের গুজব ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে প্যানিক বায়িং (আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা)-এর জন্ম দেওয়া। তিন. যোগসাজশ : আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতারা মিলে চুক্তি করে একটি নির্দিষ্ট দামবেঁধে দেওয়া, যা মুক্ত বাজার অর্থনীতির পরিপন্থি।
এ পরিস্থিতির সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার জাগরণ। ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল মেশানো বা সিন্ডিকেট করে উপার্জিত টাকা দিয়ে সন্তানদের খাওয়ানো মানে তাদের জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করা। ইসলাম সৎ ব্যবসায়ীকে কত বড় মর্যাদা দিয়েছে তা রাসূল (সা.)-এর এ বাণী থেকে স্পষ্ট : ‘সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।’ (তিরমিজি)। শোষণের মানসিকতা পরিহার করে ব্যবসাকে ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। ভোক্তাদেরও অসংযমী আচরণ পরিহার করতে হবে। সংকটের কথা শুনেই এককালীন ৩-৪ মাসের পণ্য কিনে ঘরে মজুত করার মানসিকতা সিন্ডিকেটকারীদের আরও সুবিধা করে দেয়।
এ সময় আমাদের রাষ্ট্রের উচিত নবীজির (সা.) মদিনা রাষ্ট্রের আদলে বাজার মনিটরিং সেলকে আরও শক্তিশালী করা। আলেমদের উচিত জুমার খুতবায়, ওয়াজ-নসিহতে এ বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করা।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্যে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া একটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট মানুষের অধিকার (হককুল ইবাদ) খর্ব করে, যা আল্লাহ তওবা করলেও ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না ভুক্তভোগী মানুষ ক্ষমা করে। দেশের এ অর্থনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে যদি আমরা ইসলামের এ সুমহান ও ইনসাফপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই সমাজ থেকে শোষণ দূর হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে।