জুলাই জাতীয় সনদকে অন্তহীন প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে বিএনপি এবং এই সনদকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করে এর মাহাত্ম্য কলুষিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
আজ (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার সময় তিনি এসব কথা বলেন। তখন সংসদে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসলকে একটা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে কলুষিত করা হয়েছে। সনদে লেখা হয়েছে—কোনো দল নির্বাচনে জিতলে তাদের ইশতেহার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। তাহলে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন কী? বিএনপি জুলাই সনদকে প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেমন বাহাত্তরের সংবিধানকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেছিল, একইভাবে বিএনপিও এখন জুলাই সনদকে ব্যবহার করছে। জুলাই গণভোট একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও গণরায় ছিল। সেই রায় অনুযায়ী দ্রুত সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত। কিন্তু বিএনপি এখন সংস্কারের পথ থেকে সরে গিয়ে কেবল নির্বাচনের ইসতেহারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।’
সাথে থাকলে সঙ্গী না থাকলে জঙ্গি
দেশের রাজনীতিতে ‘সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি’—এই সংস্কৃতির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সংসদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিভাজন থাকা কাম্য নয়।
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি বিগত ৫০ বছর ধরে চলছে। কিন্তু এর সমাধান কেন হলো না? বিএনপি ২৯ বছর জামায়াতের সাথে রাজনীতি করেছে। এখন সবাই বলে— সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। এর মিমাংসা করার দায়িত্ব ছিল বড় দলগুলোর।’
নাহিদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পরে জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ আর বিপক্ষ বলে ভাগ থাকবে এটা আমরা প্রত্যাশা করি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ইতিহাসের এই বির্তক আমাদেরকে সমাধান করতে হবে। সব পক্ষকেই এটার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো দেশের ষড়যন্ত্র না, আবার মুক্তিযুদ্ধের নাম করে এ দেশে যে লুটপাট, ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে সেটাও ভোলা যাবো না।
এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ফাউন্ডেশন, এটা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই নবায়ন। আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বিতর্ক একপাশে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে বা পক্ষ-বিপক্ষ কার্ড খেলে জনগণকে আর ভাগ করা যাবে না।’
সরকারি দলের এমপিদেরই ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ
বর্তমান সংসদ সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। যার অধিকাংশই সরকারি দলের এবং তারা বড় মাপের ঋণখেলাপি বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
এই বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করার সুবিধা দিতেই একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
টিআইবির দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সরকারি দলের যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। সংসদ সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। নির্বাচনের আগে তারা কিছু টাকা জমা দিয়ে এগুলো পুনঃতফসিল করে নিয়েছে। আর বর্তমান গভর্নর এই পুনঃতফসিল কাজেই এক্সপার্ট। সেজন্যই তাকে এই পদে বসানো হয়েছে।’
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে যাতে হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যায়। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে সাধারণ মানুষের আর কোনো আস্থা নেই বলেও দাবি করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
এ ছাড়া নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের বিধান অনুযায়ী ঋণ খেলাপি কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে না। কিন্তু আমরা দেখলাম নির্বাচনের আগে কিছু টাকা পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিল করে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে আসলেন। আমি কিছু সংখ্যা বলছি। ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ৭৬৫ কোটি টাকা, ৬৭৯ কোটি টাকা, ৬২১ কোটি টাকা, ২০১ কোটি টাকা, ১৮২ কোটি টাকা, ৯৭ কোটি টাকা। এগুলো আমাদের সংসদ সদস্য যারা তাদের ঋণ।