• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন

আবাহনীর আকাশি অধ্যায়ে বিদায়ের সুর

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩৫ Time View
Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ঢাকার ক্রীড়া অঙ্গনে নেমে এসেছে এক গভীর শূন্যতা। আকাশি জার্সির ভাঁজে, পুরোনো হকি স্টিকের স্মৃতিতে, আবাহনীর ইতিহাসের পাতায় যেন হঠাৎ থমকে গেছে সময়। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক কিংবদন্তি হকি ও ফুটবল খেলোয়াড়, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা আবাহনী লিমিটেডের সাবেক পরিচালক আব্দুস সাদেক শনিবার (২০ জুন) সকালে ঢাকার গুলশানের কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন, (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

তার বিদায়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবাহনী পরিবার, হকি অঙ্গন এবং পুরো ক্রীড়াঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।

১৯৪৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পুরাণ ঢাকায় জন্ম নেওয়া আব্দুস সাদেকের জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ এক ছেলেবেলার মধ্যে, কিন্তু শেষ হয়েছিল অসাধারণ এক ইতিহাস হয়ে। আর্মানিটোলা সরকারি স্কুলে পড়াকালীন সময়েই তার প্রতিভা ধরা পড়ে। ফুটবল, হকি, ক্রিকেট—অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত হকিই তাকে ইতিহাসে স্থায়ী করে দেয়।

ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে জাতীয় হকি প্রতিযোগিতায় খেলেছেন। আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষেও মাঠে নেমেছেন, পাকিস্তান জাতীয় দলের জার্সিও গায়ে তুলেছেন ১৯৬৯ সালে।

স্বাধীনতার পর একটি নতুন দেশের নতুন স্বপ্নের দিনে যখন খেলাধুলার কাঠামো দাঁড়াচ্ছিল, তখন সামনে দাঁড়ানো মানুষদের একজন ছিলেন আব্দুস সাদেক। তিনি হন বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের প্রথম অধিনায়ক। ১৯৭৮ সালের এশিয়ান গেমসে তিনি দেশের আন্তর্জাতিক হকি অভিযাত্রার নেতৃত্ব দেন। সেই সময় তার কাঁধে ছিল একটি নতুন দেশের সম্মান।

আব্দুস সাদেকের গল্প শুধু জাতীয় দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। আবাহনী লিমিটেডের ইতিহাসে তিনি একটি ভিত্তির নাম। তিনি ছিলেন ক্লাবটির প্রথম অধিনায়ক হকি ও ফুটবলের। নতুন ক্লাবের শুরুর সেই দিনগুলোতে যখন পরিচয় তৈরি হচ্ছিল, তখন আকাশি জার্সির প্রথম নেতৃত্ব ছিল তার হাতে। পরে তিনি কোচ হিসেবেও আবাহনীকে সাফল্যের পথে নিয়ে যান।

মাঠে তিনি খেলতেন সেন্টার–হাফ পজিশনে। কিন্তু তার আসল শক্তি ছিল চোখে দেখা যায় না এমন জায়গায়—ম্যাচের গতি বোঝা, সতীর্থদের গুছিয়ে নেওয়া, প্রতিপক্ষের ছন্দ ভেঙে দেওয়া।

খেলা ছাড়ার পরও তিনি হারিয়ে যাননি। তিনি হয়ে উঠেন সংগঠক, প্রশাসক, পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ বিওএ’র কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন। খেলোয়াড় গড়ার পেছনে তার অবদান ছিল নীরবে।

আব্দুস সাদেকের অবদানের স্বীকৃতি আসে ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের মাধ্যমে।

ক্রীড়াঙ্গনের বহু প্রজন্ম তাকে সাদেক ভাই বলে চিনেছে একজন অভিভাবক, শিক্ষক ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে।

আজ কোনো মাঠে তার কণ্ঠ শোনা যাবে না, কোনো ড্রেসিংরুমে তার নির্দেশনা থাকবে না। কিন্তু বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে, আবাহনীর আকাশি স্মৃতিতে, আর যারা খেলাকে শুধু ফলাফলের বাইরে দেখেছেন তাদের কাছে আব্দুস সাদেক থেকে যাবেন এক স্থায়ী ছায়া হয়ে। হকির স্টিক থেমে গেছে। একজন অধিনায়কের নেতৃত্ব থেমে যায়নি। তিনি রয়ে গেলেন ইতিহাসে, শ্রদ্ধায়, আর আবাহনীর আকাশি আকাশজুড়ে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category