ষাটের দশকে যখন সিটি অব গড প্রতিষ্ঠা হয়, কাছাকাছি সময়ে মোহাম্মদপুরেও প্রকল্প নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।
মোহাম্মদপুরের আর্থসামাজিক অবস্থা ও ইতিহাস নিয়ে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজর্ষি দাশগুপ্ত এবং শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ একটি গবেষণা করেছেন। ২০০৭ সালে প্রকাশিত এই গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকার পশ্চিম অংশে তেজগাঁও, ধানমন্ডি ও লালমাটিয়া এলাকা উন্নত আবাসনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। নতুন বিত্তশালী, ক্ষমতাবান ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সেখানে বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু এ অঞ্চলগুলোর পাশে মোহাম্মদপুর তখনো শহরের অংশ ছিল না। মোহাম্মদপুর ছিল বন্যাকবলিত, নিম্নভূমি ও অবহেলিত এলাকা।
গবেষণা নিবন্ধে আরও বলা হয়, ষাটের দশকের শুরুতে আটটি ছোট গ্রামের সমন্বয়ে মোহাম্মদপুর নামে একটি নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় সরকার। এ সময় ‘মোহাম্মদপুর মডেল টাউন’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। দেশভাগের পর সেখানে ভারত থেকে আসা বিহারিদের (আটকে পড়া পাকিস্তানি) পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা হয়। মূলত এটি ছিল একধরনের আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর বন্যার কবল থেকে রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাঁধটি পরে ‘রিং রোড’ নামে পরিচিতি পায়। টাউন হল থেকে আদাবর পর্যন্ত বিস্তৃত এ অঞ্চলেই মোহাম্মদপুরের আধুনিক বিকাশের সূচনা।
মোহাম্মদপুর ছিল জলাভূমি, টিলা ও জঙ্গলঘেরা। রাজর্ষি দাশগুপ্ত ও শাওন আকন্দের গবেষণা নিবন্ধ অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকে বরাদ্দ পাওয়া বাড়িগুলোর একটি অংশ বিহারিরা বিক্রি করে দেন। তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বহু পরিবার সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। আবার অনেক বিহারির বাড়ি দখল হয়ে যায়, ফলে তাঁরা আশ্রয় নেন জেনেভা ক্যাম্পে।
সত্তরের দশকের শুরুতেও ‘মোহাম্মদপুর মডেল টাউন’ অংশটিই মোহাম্মদপুর ছিল। এখন পশ্চিম দিকে বছিলা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশটির বিকাশ শুরু হয় আশির দশক থেকে। ওই সময় থেকেই মোহাম্মদপুরের পাড়ামহল্লায় ছোট ছোট অপরাধী দল বা ‘গ্যাং’ গড়ে উঠে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পুরোনো বাসিন্দারা।
শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুরের জন্মই হয়েছে একধরনের উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতাও ভিন্ন। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মোহাম্মদপুরের পরিবর্তন হয়েছে।
নব্বইয়ের দশক: ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের’ উত্থান
মোহাম্মদপুরের ছোট অপরাধী দলগুলো বড় হয় গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, তখন ঢাকার সন্ত্রাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বাড়তে থাকে। তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। রাজনৈতিক দলের হয়ে আধিপত্য বিস্তারেও কাজ করত তারা। রাজনীতি ও অপরাধের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুনের ঘটনাও ছিল অনেকটা নিয়মিত।
মামলার নথি, পুরোনো পত্রিকা ও পুলিশের প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে মোহাম্মদপুরে বড় অপরাধী দলের নিয়ন্ত্রক ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ। তিনি আলোচনায় আসেন ১৯৯৩ সালে ছাত্রদল নেতা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে। তখন জোসেফের ভাই হারিস আহমেদও বড় সন্ত্রাসী ছিল। কিন্তু আলোচনায় ছিল জোসেফের নাম।
১৯৯৬ সালে জোসেফের বাহিনী ঠিকাদার মোস্তাফিজুর রহমানকে খুন করে। এই মামলায় জোসেফ ও তাঁর ভাই আবু সাঈদ টিপুকে ১৯৯৭ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। জোসেফের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০ বছর সাজা খাটার পর ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পান। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে তিনি দেশ ছাড়েন।
একসময় জোসেফের বাহিনীর সদস্য ছিলেন সানজিদুল ইসলাম (ইমন) ও তাঁর শ্যালক নাঈম আহমেদ (টিটন) এবং ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। এঁদের মধ্যে ইমন ও পিচ্চি হেলাল পরে আলাদা সন্ত্রাসী দল গঠন করেন এবং তাঁদের নাম পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ওঠে।
১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অন্তত সাতজন খুন হন মোহাম্মদপুরে।
১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ ইমন পক্ষের হাতে খুন হন জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তাঁর বন্ধু এমরান।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ। ওই তালিকায় মোহাম্মদপুরের ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও হারিস আহমেদের (সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও জোসেফের ভাই) নাম ছিল। হারিস ছাড়া বাকিরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। এই সুযোগে তখন স্থানীয় কোনো কোনো বিএনপি নেতার প্রশ্রয়ে নতুন কিছু অপরাধী দল তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এহসানুল হক সেতু, আবুল হাসেম হাসু, নবী উল্লাহ (স্থানীয়) ও কে এস আহমেদ রাজু।
২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ওই চার বছরে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে বিএনপির অন্তত ৩০ নেতা-কর্মীসহ ৪০ জন নিহত হন। ২০০৪ সালে গঠিত হয় র্যাব। এরপর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একের পর এক সন্ত্রাসী নিহতের ঘটনা শুরু হলে অনেক সন্ত্রাসী এলাকা ছেড়ে পালায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ে মোহাম্মদপুরে অপরাধের নতুন মাত্রা পায়। ‘কিশোর গ্যাং’ বা কিশোর ও তরুণদের অপরাধী দল বাড়তে থাকে। মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি-বাড়ি দখলসহ নানা অপরাধে জড়ায় তারা। বেশির ভাগ গ্যাংয়ের আশ্রয়দাতা ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের একান্ত সচিব (পিএস) মাসুদুর রহমান ওরফে বিপ্লব, আজিজ আহমেদ ও জোসেফের ভাতিজা সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব এবং আসিফ আহমেদ। বাজার, মসজিদ কমিটি থেকে ফুটপাত ও বাসস্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করত এসব বাহিনী।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগপর্যন্ত এভাবেই চলছিল। এই সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান পুলিশের তালিকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। এর এক দিন পর ১৬ আগস্ট জামিনে মুক্ত হন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মোহাম্মদপুর এলাকার একাংশের অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন পিচ্চি হেলাল। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ইমনের। এলাকার আধিপত্য বিস্তার, দখলবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি বাড়তে শুরু করে।
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। এতে পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়।
২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলে মোহাম্মদপুরের শের শাহ সুরী সড়কে আবাসন ব্যবসায়ী মনির আহমেদের বাসায় ঢুকে দুই দফা গুলির ঘটনা ঘটে। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পিচ্চি হেলাল ও ইমনের বিরোধের জেরে গুলির ঘটনাটি ঘটেছে।
শুধু চাঁদাবাজি বা মাদক ব্যবসা নয়, তুচ্ছ কারণে অপরাধীদের হামলার শিকার হন মোহাম্মদপুরের সাধারণ মানুষ। যেমন গত বছর ১৫ মে গভীর রাতে একটি পরিবারের সাতজনকে কুপিয়ে আহত করে ‘পাটালি গ্রুপে’র সদস্যরা। গত অক্টোবরে সেই বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায় গৃহকর্তা আবুল কাশেমকে। কথা শুরু করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আবুল কাশেম বলেন, ঘটনার দিন গভীর রাতে তিনটি ছেলে বাসায় উঁকি দিচ্ছিল। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কেন বাসায় উঁকি দিচ্ছে তারা। তিনি বলেন, এটা জিজ্ঞেস করাতেই হামলা করে তারা। তাঁর পরিবারের সাতজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়।
অপরাধীরা এখন কাদের আশ্রয়ে
ঢাকা মহানগর পুলিশ গত বছরের অক্টোবর মাসে ঢাকার অপরাধী দল নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোহাম্মদপুরে যে বড় ১৭টি অপরাধী দল সক্রিয় হয়, এর অন্তত ৬টির আশ্রয়দাতা স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পাঁচজন নেতা। আরও তিনটি চলে তিন শীর্ষ সন্ত্রাসী—পিচ্চি হেলাল, ইমন ও নবী হোসেনের আশ্রয়ে। বিএনপির সমর্থক দাবি করা আরও তিন সন্ত্রাসী (অ্যাক্সেল বাবু, পাপ্পু ও লম্বু মোশারফ) তিনটি বাহিনী চালান।
‘পাটালি গ্রুপের’ আশ্রয়দাতা হিসেবে নাম এসেছে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম (অপু) এবং ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান রেজার। জহিরুল ইসলাম বলেন, তিনি কোনো সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেন না। প্রতিপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে।
যদিও মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠার পর জহিরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে প্রত্যাহারও করা হয়।
অপরাধী দলের আশ্রয়দাতা হিসেবে নাম এসেছে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মান্নান শাহীন, একই ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ হোসেন মোড়লেরও।
যদিও পিচ্চি হেলালের অন্যতম সহযোগী হিসেবে নাম আসার পর গত বছর জুনে জাহিদ মোড়লকে বহিষ্কার করে যুবদল। তিনি এখন পলাতক।
এক অনুসন্ধানে পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তার সঙ্গেও অপরাধীদের ঘনিষ্ঠতার তথ্য পাওয়া গেছে। যেমন গত ১০ সেপ্টেম্বরে নবীনগর হাউজিং এলাকায় দুই তরুণ মো. সুজন ওরফে বাবুল ও মো. হানিফকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, দুটি হত্যাই ছিল আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষ, নেতৃত্বে ছিলেন ১০০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আক্তার হোসেন। ছিনতাই প্রতিরোধের নামে তাঁরাই বিভিন্ন অপরাধে জড়ান। কিন্তু পুলিশ ঘটনাটিকে ‘গণপিটুনি’ বলে প্রচার করে এবং মামলা নেয়নি।
মামলা না নেওয়ার বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিকুল আহমেদ দাবি করেন, তদন্তে প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি নিহত দুজনকে ‘ছিনতাইকারী’ বলে অভিহিত করেন।
যদিও ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, সেটা কোনো গণপিটুনি ছিল না। কয়েকজন মিলে ওই দুই তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করে। তাঁরা কারা, তা স্পষ্টই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল। ঘটনাটিতে কোনো মামলাই হয়নি।
থানা–পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের আয়তন ৭ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা (২০২২) হিসাবে, মোহাম্মদপুরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭০ হাজার ৯৩৯ জন মানুষ বাস করেন, যা ঢাকার গড় জনঘনত্বের দ্বিগুণের বেশি (ঢাকার গড় ৩৩ হাজার ৬৫৭ জন)।
ভৌগোলিকভাবে পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—এই তিন ভাগে মোহাম্মদপুরকে ভাগ করা যায়। পূর্বাঞ্চলটির পূর্বের অংশটি মিরপুর রোডের পশ্চিম পাশ থেকে আসাদ গেট হয়ে শ্যামলী পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিম দিকে এই অংশের বিস্তৃতি রিং রোড পর্যন্ত। এ অংশেই দেশের সবচেয়ে বড় জেনেভা ক্যাম্পের অবস্থান।
স্থানীয়ভাবে রিং রোডের পশ্চিমাংশকে মধ্যাঞ্চল ধরা হয়, যা বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত। আর পশ্চিমাঞ্চল ধরা হয় বেড়িবাঁধের পশ্চিম অংশ, যা বুড়িগঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধপ্রবণতা বেশি মূলত জেনেভা ক্যাম্প এলাকা, মধ্যঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে। এসব এলাকায় নিম্ন আয় ও ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি।
মোহাম্মদপুর এলাকাটি র্যাব-২–এর আওতাধীন। এর অধিনায়ক মো. খালিদুল হক বলেন, অপরাধবিজ্ঞানে বাস্তুবিদ্যার যে সূত্র, মোহাম্মদপুরে সবকিছুই বিদ্যমান। মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। অপরাধ করে তারা দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে অপরাধীরা দ্রুত বুড়িগঙ্গার ওপারে পালিয়ে যায়।
রাজধানীর ৫০ থানাকে আটটি অপরাধ বিভাগে ভাগ করে কাজ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পুলিশের ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তেজগাঁও বিভাগে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও মাদকের মামলা সবচেয়ে বেশি। তেজগাঁও বিভাগের অধীনেই পড়েছে মোহাম্মদপুর।
মোহাম্মদপুরের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে আরও দুটি কারণ উল্লেখ করেন পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা। একটি হলো আবাসন ব্যবসার প্রসার ও ‘জেনেভা ক্যাম্প’। মোহাম্মদপুরে ছোট–বড় ৯৭টি আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই ব্যবসার ‘কাঁচা টাকা’ ধরতে অপরাধী দলগুলো সক্রিয়।
জেনেভা ক্যাম্পের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই ক্যাম্পের কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ কম। দারিদ্র্য আছে। ফলে খুব সহজেই তাদের অপরাধে জড়িত করা যায়। জেনেভা ক্যাম্পে ঢাকার মাদক ব্যবসারও অন্যতম কেন্দ্র। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয় এবং জেনেভা ক্যাম্পে ১০ জন খুন হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, পুলিশের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং নজরদারির কারণে এ অঞ্চলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আছে। অভিযান চালিয়ে নিয়মিত আসামি না ধরা হলে পরিস্থিতি আরও অনেক ভয়াবহ হতো।
পুলিশ ও র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত ২০ মাসে মোহাম্মদপুর থেকে ৪ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ জনকে। র্যাব গ্রেপ্তার করেছে ১ হাজার ২০০ জনকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১০ জন রয়েছেন, যাঁরা বিভিন্ন অপরাধী দলের নেতা।
অবশ্য অপরাধের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। যার উদাহরণ ১২ এপ্রিল অ্যালেক্স ইমন ও ১৫ এপ্রিল ‘লম্বু আসাদুলকে’ কুপিয়ে হত্যা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ‘প্রো–অ্যাকটিভ’ (স্ব–উদ্যোগ) পুলিশিং ছাড়া এ অঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধীদের নিষ্ক্রিয় রাখতে আগে থেকেই তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব সংস্থাকে একযোগে অপরাধীদের নিষ্ক্রিয় করতে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো, অপরাধ করে কেউ যেন পার না পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তাঁরা অপরাধী দলের হাত থেকে মুক্তি চান
মোহাম্মদপুর নিয়ে কথা বলতে গত নভেম্বরে সেখানকার একটি বাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে জড়ো হয়েছিলেন আটজন ব্যক্তি, যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তিন থেকে চার দশক ধরে মোহাম্মদপুরে বাস করছেন।
দীর্ঘ আলাপে মোহাম্মদপুর নিয়ে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করলেন তাঁরা। ইতিহাস জানালেন, নিজেদের গল্প বললেন, বললেন আক্ষেপের কথা। একজন বললেন, অপরাধ ও অপরাধী দলের কারণে ঢাকার মানুষ তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে। এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে অপরাধ মানেই মোহাম্মদপুর। তাঁরা অপরাধী দলের হাত থেকে মুক্তি চান। নিজের নামটি প্রকাশিত হোক, তা তিনি চাননি। কারণ, নিরাপত্তার অভাব।