দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবারো সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। গত কয়েকদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ এবং কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার মূল সূত্রপাত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্টের প্রতিবাদে ছাত্রদলের শাহবাগ থানায় মামলা করতে আসাকে কেন্দ্র করে। জানা যায়, ছাত্রদল শাহবাগ থানায় মামলা করতে গেছে খবর পেয়ে থানায় আসেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির ও ডাকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাংবাদিকও ঘটনাস্থলে আসেন। বিষয়টি নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই সময় থানার সামনে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিকের ওপর চড়াও হয় প্রতিপক্ষ। এ সময় থানার ভেতরে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের আটকা পড়েন। পরে তাদের মসজিদ গেট দিয়ে বের করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের ছাড়াও সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের যে পোস্টকে ঘিরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত, ওই ঘটনা তদন্তের জন্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক ড. মো. আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া শাহবাগ থানার অভ্যন্তরে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুব কায়সারকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির নেতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দখলদারি প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। পুলিশের উপস্থিতিতেই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হলেও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হামলায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
সম্প্রতি ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতার ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রথমটি ঘটে চট্টগ্রামে। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও কলেজের শিক্ষার্থীদের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় ক্যাম্পাসের একটি ভবনে আঁকা গ্রাফিতিতে লেখা ছিল, ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। পরে কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে সেখানে ‘গুপ্ত’ লেখেন। এ ঘটনায় সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দুই দফায় সংঘর্ষ চলে। এ সময় অনেককে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা হাতে দেখা গেছে। দুই পক্ষেরই দাবি এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এদিন প্রথম দফায় কলেজ ক্যাম্পাস ও নিউমার্কেট সংলগ্ন আইস ফ্যাক্টরি সড়কে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রশিবির বিকাল ৪টায় নিউমার্কেট এলাকায় সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেয়। ওই সময় উভয় পক্ষের মিছিল মুখোমুখি হলে আবারো সংঘর্ষ হয়। কলেজের সামনে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
বিষয়টি নিয়ে সংসদে কথা বলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি জাতীয় সংসদে অভিযোগ করেন, নিউমার্কেটে গত ২৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহাসমাবেশে যারা আক্রমণ করেছিল, তারাই আজকে সিটি কলেজে আক্রমণ করেছে। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনার তদন্ত না করে কাউকে দোষারোপ না করার আহ্বান জানান।
এ ঘটনার জেরে প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ক্লাস ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু ছালেহ বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাস শান্ত রয়েছে। পুরো ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, কমিটি আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। আমরা আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে।
এ ঘটনার একদিন পর বৃহস্পতিবার পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ চত্বরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এদিন পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বকুল মোড় থেকে একটি মিছিল নিয়ে কলেজ গেটের দিকে রওনা হন। মিছিলটি কলেজের মূল ফটকের সামনে পৌঁছালে সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, যা একপর্যায়ে তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় কলেজ শাখা ছাত্রদলের কার্যালয় ভাংচুর ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির পরস্পরকে দোষারোপ করে। কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সজীব হাসান বলেন, ‘ছাত্রদল বহিরাগতদের নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছিল। সেখানে আমরা ছাত্রদের নিয়ে বিক্ষোভ করার সময় ছাত্রদলের কর্মীরা আমাদের মিছিলকে উদ্দেশ করে ইটপাটকেল ছোড়ে। আমরা তা প্রতিহত করার চেষ্টা করলে তারা আমাদের উদ্দেশ করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।’
ঈশ্বরদী কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি খালেদ বিন পার্থিব বলেন, ‘কলেজের সামনে ছাত্রদলের পূর্বনির্ধারিত অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে ছাত্রশিবির মিছিল নিয়ে সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় প্রথমে ইটপাটকেল ও পরে গুলিবর্ষণ করে। একপর্যায়ে তারা ছাত্রদলের অফিস ভাংচুর করে।’
এছাড়া বৃহস্পতিবার কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘গুপ্ত শিবির’ বলাকে কেন্দ্র করে গতকাল বিকালে একজন শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ ঘটনার বিচারের জন্যই সন্ধ্যায় অধ্যক্ষের কক্ষে যায় ছাত্রশিবির। অধ্যক্ষ বিচারের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করেন। কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচার দাবি করে ছাত্রশিবির। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদলের কোনো কমিটি নেই।
এ বিষয়ে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মাজারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখানে কোনো ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের স্লোগান ছিল না। বৃহস্পতিবার বিকালে একজনকে থাপ্পড় মারাকে কেন্দ্র করেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।’
হঠাৎ করে ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা নিয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, গত দুই বছর ধরে আমাদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র হয়েছে কিন্তু ছাত্রদল সবসময়ই ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে দেখেছি এ অপ্রপচার, ষড়যন্ত্র আরো বেড়েছে। এছাড়া আমরা গুপ্ত রাজনীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছি, কারণ দুই বছরে যে মবগুলো হয়েছে তার বেশির ভাগই হয়েছে গুপ্ত রাজনীতিতে জড়িতদের দ্বারা। এ কঠোর অবস্থানের কারণেও বিরোধীদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব অনেক বেড়েছে। মূলত এসব কারণেই তারা চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অশান্ত করার। তবে তারা যা-ই করুক ছাত্রদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগরী ও কলেজ শাখাগুলোর সঙ্গে জরুরি সভা করেছি। নির্দেশনা দিয়েছি যাতে তারা সর্বোচ্চ ধৈর্যশীল থাকে ও কোনো ষড়যন্ত্রে পা না দেয়। একই সঙ্গে আমরা ছাত্রশিবিরকেও আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন গুপ্ত রাজনীতি পরিহার করে। ছাত্রদলের সমালোচনা করুন কিংবা যা কর্মসূচিই পালন করুন সেটি আপনাদের নিজেদের পরিচয়ে করুন।’