• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০১:০২ পূর্বাহ্ন

ইউরোপ-আমেরিকায় বন্ধের পথে বাংলাদেশের মসলা রপ্তানি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ Time View
Update : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে মসলাসহ বেশকিছু খাদ্যপণ্য, পশুখাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী রপ্তানির আগে সেগুলো তেজস্ক্রিয়তার (গামা রেডিয়েশন) মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করতে হয়। বাংলাদেশে এ তেজস্ক্রিয়তা সেবা দিয়ে আসছে সরকারি পরমাণু শক্তি গবেষণা কমিশনের দুটি প্রতিষ্ঠান। তবে দিন দিন এসব প্রতিষ্ঠানের তেজস্ক্রিয়তা মেশিনের কার্যক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে। যে কারণে এখন বেসরকারি খাতগুলো বাণিজ্যিক সেবা দেওয়া প্রায় বন্ধ। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মসলাসহ ওইসব পণ্যের রপ্তানি।

খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টন শুধু বাংলাদেশি মসলার চাহিদা রয়েছে। সেখানে জীবাণুমুক্ত সেবা বন্ধ থাকায় বছরে কয়েকশ টনও রপ্তানি হচ্ছে না। বাংলাদেশের এই দুর্বলতায় বাজারটি দখল করছে প্রতিবেশী দেশগুলো। এখন পর্যাপ্ত গামা তেজস্ক্রিয়তা সেবা পেলে রপ্তানি আরও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থার কথা জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।

যে কারণে এ সমস্যা
রপ্তানি পণ্য ও সামগ্রী জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহার করা হয় গামা তেজস্ক্রিয়তা। পরমাণু শক্তি গবেষণা কমিশনের আওতাধীন ইনস্টিটিউট অব রেডিয়েশন অ্যান্ড পলিমার টেকনোলজিতে (আইআরপিটি) প্রথম এ সেবা চালু হয় দেশে। ২০০৯ সালে এ সেবার শুরুতে কেন্দ্রটির তেজস্ক্রিয়তা মেশিনের কার্যক্ষমতা ছিল ৩৫০ কিলো কিউরি, যা এখন কমে ৪০ কিলো কিউরিতে নেমেছে।

ফলে গত কয়েক বছর আগেও যেখানে বছরে আড়াইশ টন মসলা জীবাণুমুক্ত করা যেতো, এখন সেটা কয়েক টনে নেমেছে। মেশিনের সক্ষমতা না থাকায় ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর থেকে বাণিজ্যিক সেবা প্রায় বন্ধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে, বিভিন্ন গবেষণার পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে জীবাণুমুক্তকরণের বাণিজ্যিক সেবা দিচ্ছে ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড রেডিয়েশন বায়োলজি (আইএফআরবি)। কিন্তু আইআরপিটির চেয়ে আইএফআরবির সক্ষমতা আরও কম। তাদের তেজস্ক্রিয়তা মেশিনের কার্যক্ষমতা মাত্র ২০ কিলো কিউরি। ফলে গত এক দশকে এ প্রতিষ্ঠান মাত্র ৪৫০ টন পণ্য জীবাণুমুক্ত করেছে। এখন বছরে হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টন।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, প্রতি মাসে এ দুই প্রতিষ্ঠানে প্রায় কয়েক হাজার টন মসলা ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য নিয়ে ধরনা দিচ্ছেন তারা। কাঙ্ক্ষিত তেজস্ক্রিয়তা সেবা না পেয়ে এসব পণ্য রপ্তানি এখন অনেকটাই বন্ধের পথে।

আইএফআরবি গামা সোর্স বিভাগের প্রধান ফিরোজ মর্তুজা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মূলত এখন শুধু গবেষণা পর্যায়ে তেজস্ক্রিয়তা সেবা দিতে পারছি। সামান্য কিছু সেমি-বাণিজ্যিক সেবা রয়েছে। কিন্তু আমাদের মেশিনের শক্তি (কার্যক্ষমতা) খুব কম। এটি স্থাপনের সময় ৫০ কিলো কিউরি হলেও এখন সেটা ২০-এ নেমে এসেছে। যে কারণে চাইলেও রপ্তানিকারকদের কাঙ্ক্ষিত তেজস্ক্রিয়তা সেবা দিতে পারছি না।’

ক্রয়াদেশ নিতে পারছেন না রপ্তানিকারকরা
রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচুর মসলা ও এজাতীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু জীবাণুমুক্ত করার সেবার অপ্রতুলতার কারণে তারা এখন ক্রয়াদেশ নিতে পারছেন না।

এ বিষয়ে দেশের অন্যতম খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাত্র ৬ থেকে ৭ টন মসলার তেজস্ক্রিয়তা সেবার জন্য আমাদের এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ কারণে বিশ্ববাজারে প্রাণের মসলা পণ্যের ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও মাসে ৫০ থেকে ৬০ টনের অর্ডার হারাচ্ছি। ঠিকমতো তেজস্ক্রিয়তা সেবা পেলে শুধু প্রাণের মসলা মাসে একশ থেকে দেড়শ টন রপ্তানি করা যাবে, যা ক্রমান্বয়ে দিন দিন আরও বাড়বে।’

দেশের আরেক অন্যতম খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের (এসএফবিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পারভেজ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত তিন বছর ধরে এ তেজস্ক্রিয়তা সেবা সমস্যা নিয়ে আমরা ভুগছি। আগে চাহিদার চেয়ে সেবা হয়তো কিছুটা কম পাওয়া যেতো, এখন সেটা প্রায় বন্ধ। যে কারণে প্রচুর অর্ডার থাকার পরেও উত্তর আমেরিকাসহ কিছু দেশের বাজার আমরা হারিয়ে ফেলেছি।’

তিনি বলেন, ‘মসলা রপ্তানির দারুণ সম্ভাবনাময় বাজার ছিল। আমরা এখন যে সামান্য রপ্তানি করছি, শুধু সেবা ঠিকমতো পেলে তা দশগুণ বাড়বে। এটি নিয়ে আমরা কয়েকবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। পর্যাপ্ত জীবাণুমুক্তকরণ সেবা চালু করলে সার্বিক কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি বাড়বে।’

রপ্তানিকারকরা বলছেন, সাধারণত একটি কনটেইনারে ২৬ টন মসলা পাঠানো যায়। কিন্তু যথাসময়ে তেজস্ক্রিয়তা সেবা না পাওয়ায় এক কনটেইনার মসলার ক্রয়াদেশ নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সামান্য কিছু মসলা রপ্তানি করতে হচ্ছে।

তারা জানান, প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ ধরনের জীবাণুমুক্তকরণ সেবা দিতে ২৬টি গামা তেজস্ক্রিয়তা কেন্দ্র চালু আছে।

দেশে গুঁড়া মসলার বাজারে পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রাণ, স্কয়ার, এসিআই পিউর, ফ্রেশ, একমি, আরকু, বসুন্ধরা, বিডি ফুডসহ বেশকিছু বড় বড় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলুদ, মরিচ, জিরা, ধনিয়া, গরম মসলা, গরু ও মুরগির মাংসের মসলা, ফুচকা-চটপটির মসলা, বিরিয়ানির মসলা, হালিম মিক্সসহ বিভিন্ন পদের মসলা দেশে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানি করছে।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিদেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি মানুষের বসবাস। তাই তাদের কাছে দেশের মসলার চাহিদাও বেশি, যা প্রায় ১৫ হাজার টনের ওপরে।

প্রকল্প শেষ, চালু হয়নি তেজস্ক্রিয়তা কেন্দ্র
বর্তমান আইআরপিটির কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছিল সরকার। প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আইআরপিটির সক্ষমতা বৃদ্ধির ওই প্রকল্পের মেয়াদ গত বছরের (২০২৫ সালের) ৩০ জুন শেষ হয়েছে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। মেশিনপত্র এলেও সেগুলো চালু করা যায়নি।

জানা গেছে, ওই প্রকল্পে আগের তেজস্ক্রিয়তা মেশিনের পাশাপাশি আরও ৪০০ কিলো কিউরি ক্ষমতাযুক্ত মেশিন বসানোর কাজ ২০২২ সালে শুরু হয় সাভারের আইআরপিটিতে। রাশিয়া থেকে রেডিয়েশন সোর্স (কোবাল্ড-৬০) ও কেন্দ্রের মেকানিক্যাল এবং ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি এসেছে গত বছর। কেন্দ্রটির মাধ্যমে বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ টন মসলাজাতীয় পণ্য জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব হতো।

ওই প্রকল্পের কাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটমের সায়েন্টিফিক ডিভিশনের একটি প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান রেডিয়েন্ট করপোরেশন। তবে কবে নাগাদ এ প্রকল্পের তেজস্ক্রিয়তা মেশিন চালু হবে তা নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে সংশয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইআরপিটির পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি সমস্যার কারণে এখনো আমরা কার্যক্রম শুরু করতে পারিনি। তবে সব ধরনের যন্ত্রপাতি কেনা শেষ। এখন এসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের কাজ বাকি। শিগগির এ কাজও শেষ হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ করা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন করতে পারছে না। যে কারণে আটকে আছে সমাপ্তির কাজ। আমরা গত সপ্তাহেও রোসাটমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বিকল্প পথে কীভাবে সমস্যা সমাধান করা যায় সেটি দেখছি।’

‘তারা বলেছে, এখন শুধু ওদের কয়েকজন এক্সপার্ট লাগবে যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের জন্য। আর মাস তিনেকের কাজ বাকি। এতটুকুর জন্য পুরো কাজ আটকে আছে।’

‘আমরা চাপ দিয়েছি। আমাদের যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। এজন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ছয় সদস্যের একটি কমিটি করে দেয়। সে কমিটিও নানান বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। তারা সেগুলো নিয়ে গেছে গত সপ্তাহে। আশা করছি, শিগগির কাজ শেষ হবে। সব ঠিক থাকলে আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে’—যোগ করেন আইআরপিটির পরিচালক রুহুল আমিন।

নতুন তেজস্ক্রিয়তা কেন্দ্র করছে বিনা
বিশ্বব্যাংকের পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ১১৫ কোটি টাকায় গাজীপুরের ভবানীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গামা সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিআইআরসি এ কেন্দ্রটি স্থাপন করবে। এটির কাজ ২০২৬ সালের মাঝামাঝি শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা।

বিনার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার প্রধান ড. মোহাম্মদ আশিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পার্টনার প্রকল্পের অর্থায়নে বিনার তত্ত্বাবধানে চীনের একটি রাষ্ট্রীয় কোম্পানির মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। নির্মাণকাজ এরই মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে এটি চালু হওয়ার আশা করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই কেন্দ্রটির মাধ্যমে দেশের কৃষিপণ্য, মসলা, ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত করে সংরক্ষণ ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। ফলে গবেষণা কার্যক্রমের পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

এদিকে, আইআরপিটির পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, ‘আমাদের ও বিনার কেন্দ্র চালু হলে দেশে তেজস্ক্রিয়তা সেবায় বড় পরিবর্তন আসবে। তখন বছরে প্রায় পাঁচ হাজার টন পণ্য জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব হবে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category