• মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৬:৩১ অপরাহ্ন

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে তামাকজাত পণ্যের কর বৃদ্ধির বিকল্প নেই: নারী মৈত্রীর সভায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ ছোবল থেকে বাঁচাতে তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও করবৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি। আজ মঙ্গলবার (১২ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী মৈত্রী আয়োজিত ‘তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তরুণদের সুরক্ষায় তামাকজাত দ্রব্যে কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এই মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আমরা তরুণদের শক্তি দেখতে পেয়েছি। বর্তমান সরকারও তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। একদিকে তরুণরা যেমন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আবার তামাক কোম্পানিগুলো নিজেদের মুনাফার লোভে ওই তরুণদেরকেই আসক্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই তামাক কোম্পানিকে লাভবান রেখে আর যাই হোক, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার যেমন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বদ্ধ পরিকর তেমনি তামাক নিয়ন্ত্রণেও তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। আসন্ন বাজেটে তামাকজাত দ্রব্যে কর ও মূল্য বৃদ্ধি করে সে লক্ষ্যে আরো এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি সংসদ অধিবেশনে বিষয়টি উপস্থাপন করবো। সেই সাথে আমি সরকারকে এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার দাবী জানাচ্ছি।’

সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তামাক ব্যবহারকারী দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ৩৫.৩ শতাংশ, যা ভারতে ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস, ২০১৭)-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ এর তথ্যমতে, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ মৃত্যু বরণ করে, পঙ্গুত্ব বরণ করে আরো কয়েক লক্ষ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ বছর তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা পক্ষান্তরে, তামাক ব্যবহারজনিত কারণে মৃত্যু, অন্যান্য স্বাস্থ্য ক্ষতি এবং পরিবেশের ক্ষতি বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার এবং ক্ষয়ক্ষতি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশের জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকি সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের তামাক কর পদক্ষেপ বা কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশের বর্তমান তামাক কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল যা তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে যথেষ্ট নয়। সিগারেটে ৪টি মূল্যন্তর (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ এবং প্রিমিয়াম) এবং অ্যাডভ্যালোরেম (মূল্যের শতকরা হার) কর প্রথা কার্যকর রয়েছে। একাধিক মূল্যস্তর এবং বিভিন্ন দামে তামাকপণ্য ক্রয়ের সুযোগ থাকায় তামাকের ব্যবহার হ্রাসে কর ও মূল্যপদক্ষেপ সঠিকভাবে কাজ করে না। করপদক্ষেপের কারণে কোন একটি তামাকপণ্যের দাম বাড়লে অথবা ভোক্তার জীবনমানে পরিবর্তন ঘটলে ভোক্তা তার পছন্দমতো তামাকপণ্য ক্রয় করতে পারে। অর্থাৎ ভোক্তা তার রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন দামে তামাকপণ্য ব্যবহারের সুযোগ পায়। বিশেষ করে নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম কাছাকাছি হওয়ায় ভোক্তা যে কোন একটি স্তরের সিগারেট বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর আহরণ সহজিকরণের জন্য বাজারে বিদ্যমান সিগারেটের স্তর চারটি থেকে নামিয়ে তিনটিতে এনে মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এই দুটি স্তরকে একত্রিত করে দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরের দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১৫০ টাকা ও অতি উচ্চ স্তরের দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ২০০ টাকা করা হোক। সেই সাথে সকল স্তরের সিগারেটের উপর বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং প্রতি ১০ শলাকার প্যকেটে ৪ টাকা হারে নির্দিষ্ট করারোপ করা হোক। এতে যেমন স্বল্প আয়ের ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে বিশেষভাবে উৎসাহিত হবে তেমনি তরুণ প্রজন্ম ধূমপান শুরু করতেও নিরুৎসাহিত হবে।

নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরামের আহ্বায়ক শিবানী ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজারে চাল-ডাল, তেল-নুন-সবকিছুর দামই বাড়ছে, কিন্তু বিড়ি-সিগারেটের দাম তেমন বাড়ে না, তাই এগুলো এখনো সবার, বিশেষ করে তরুণ আর নিম্ন আয়ের মানুষের হাতের নাগালেই রয়ে গেছে। এই জন্য তামাকসেবন কমছে না, বরং আরও বাড়ছে। সরকারের অংশ হিসেবে বর্তমান সরকারের কাছে আমার দাবি-তামাকপণ্যের দাম বাড়ান, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।’

বিষয়ভিত্তিক প্রেজেন্টেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, বলেন, ‘দেশে তামাকপণ্যের খুচরামূল্য বা ভিত্তিমূল্য খুবই কম। তাই করহার বেশি হলেও তা তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে তেমন কোন অবদান রাখে না। এই ত্রুটিপূর্ণ কর-কাঠামোই স্ববিরোধ তৈরি করেছে এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো রাজস্ব বোর্ডকে কর না বাড়ানোর ব্যাপারে প্রভাবিত করে থাকে। সম্পূরক শুল্ক না বাড়িয়ে কেবল মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের দাম বাড়ানো হলে বর্ধিত মূল্যের একটি বড় অংশ তামাক কোম্পানির পকেটে চলে যায়। কিন্তু এই প্রস্তাবনা অনুসরে মূল্য বৃদ্ধি ও করারোপ করলে প্রায় ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে; ৩ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে; এবং ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তামাক কর রাজস্ব পাওয়া যাবে। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় হবে।

নারী মৈত্রী তামাক বিরোধী ইয়ূথ ফোরামের সদস্যস মো. আবীর হোসেন বলেন, ‘একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণসমাজের উপর। আমরা তরুণরাই যদি আসক্ত হয়ে পরি তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ খারাপ দিকে যাবে। তামাক কোম্পানিগুলো সুচতুরভাবেই আমাদেরকে টার্গেট করে আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। আর এই আসক্তি থেকে বাঁচার একটি অন্যতম উপায় হলো তামাকজাত দ্রব্যের কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি করে তামাকজাত দ্রব্যকে তরুণদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া। সরকারকে এই বিষয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আসন্ন বাজেটে তামাকজাত দ্রব্যের কর ও মূল্য বৃদ্ধি করতে হবে।

নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, শিক্ষক ফোরাম, সাংবাদিক ফোরাম ও ইয়ূথ ফোরামের সদস্যবৃন্দ। উপস্থিত সকলেই তামাকজত দ্রব্যে কর বৃদ্ধির করার জোর দাবি জানান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category