‘ঠাকুরের জন্মদিন ঘিরে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখে আসছি কুঠিবাড়ির মেলা। মেলার কয়েকদিন আগে থেকেই মেয়ে-জামাই আর আত্মীয়-স্বজনরা শিলাইদহে ভিড় করতেন। বাড়ির আঙিনায় উৎসব লেগে থাকতো। কিন্তু এবার নাকি একেবারেই মেলা হচ্ছে না, দোকানদাররা সব চলে যাচ্ছে।’
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে কথাগুলো বলছিলেন কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের কসবা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম। তার আক্ষেপেই ফুটে উঠছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির চিরচেনা চিত্র বদলে যাওয়ার বেদনা।
জানা গেছে, আগামী ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। প্রতিবছর এই উৎসবকে ঘিরে কুঠিবাড়ির আমবাগানে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা বসলেও, এবার দীর্ঘদিনের সেই প্রথা ভেঙে মেলা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। তবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কুঠিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকলেও মেলার কেন এই ‘নিষেধাজ্ঞা’, তা নিয়ে রবীন্দ্রভক্ত ও স্থানীয়দের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের পসরা গুছিয়ে নিচ্ছেন। কারও চোখে জল, কারও মুখে তীব্র আক্ষেপ। প্রায় ২০ বছর ধরে এই মেলায় আসা মাদারীপুরের আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, টাকা-পয়সা খরচ করে দূর থেকে আসছি। এসে শুনলাম মেলার অনুমতি নেই। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছি। সামনের বছর আর আসব না।’
শরীয়তপুরের খেলনা ব্যবসায়ী মীর বাবুল জানান, গত বুধবার বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে দোকান ভেঙে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার দাবি, শতাধিক ব্যবসায়ী দোকান বসিয়েছিলেন, যাদের প্রত্যেকের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক লোকসান হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে একই সুর—কুঠিবাড়ি মেলার যে ঐতিহ্য ছিল, তা এবারই যেন হারিয়ে গেল।
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ আব্দুস সাত্তার (৭২) বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে কোনো বছর এই মেলা মিস হয়নি। ঐতিহ্যবাহী কুঠিবাড়ির এই গ্রামীণ মেলা যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখা উচিত ছিল।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( সার্বিক) জাকির হোসেন বলেন, কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী আলোচনা সভা ও কালচারাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তবে প্রস্তুতি সভায় সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এবার মেলা হচ্ছে না।