ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক নাটক শুরু হয়েছে। অভিনেতা বিজয়ের দল টিভিকে দাবি করছে, এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হওয়ায় সরকার গঠনের সুযোগ তাদেরই পাওয়া উচিত। তবে গভর্নর সেই দাবি নাকচ করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ডিএমকে বা এআইএডিএমকে সরকার গঠনের চেষ্টা করলে দলের ১০৭ জন বিধায়কই পদত্যাগ করবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে টিভিকে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, এম কে স্টালিনের ডিএমকে বা ই পালানিস্বামীর এআইএডিএমকে— এই দুই দলের কেউ সরকার গঠনের চেষ্টা করলে দলের সব বিধায়ক পদত্যাগ করবেন বলে অভিনেতা বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগম (টিভিকে) হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দলীয় সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
ডিএমকে ও এআইএডিএমকে শিবিরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরই টিভিকে এই সিদ্ধান্ত নেয়। বিজয়ের দলের সন্দেহ, জনসমর্থনে এগিয়ে থাকা টিভিকেকে সরকার গঠন থেকে দূরে রাখতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে সমঝোতার পথে হাঁটছে।
১০৭টি আসনে জয় পাওয়া টিভিকের দাবি, এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হওয়ায় সরকার গঠনের আমন্ত্রণ তাদেরই পাওয়া উচিত। তবে বুধবার গভর্নর আর ভি আর্লেকার বিজয়কে সরকার গঠনের দাবি উপস্থাপনের সুযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, সরকার গঠনের জন্য টিভিকের হাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক আসন নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বিজয় যে পরিকল্পনা দিয়েছিলেন, তাও গ্রহণ করা হয়নি।
সূত্র জানায়, টানা দ্বিতীয় দিনের বৈঠকেও গভর্নর অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয়কে ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র জমা দেয়ার শর্ত দেন। রাজভবনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন টিভিকে এখনও দেখাতে পারেনি।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে টিভিকের আরও ১০টি আসন প্রয়োজন। ইতোমধ্যে কংগ্রেসের পাঁচ বিধায়কের সমর্থন পেয়েছে দলটি। বাকি আসনের জন্য বাম দল ও ছোট কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দলটি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনাও করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে ডিএমকে বুধবার এক বৈঠকে চারটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এর একটি অনুযায়ী, দলীয় প্রধান এম কে স্টালিনকে ‘জরুরি সিদ্ধান্ত’ নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ডিএমকে জানিয়েছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য আরেকটি নির্বাচন এড়ানো, স্থিতিশীল সরকার গঠন করা এবং ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিকে’ সুযোগ না দেয়া।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকাকে ‘জটিল সংকট’ উল্লেখ করে ডিএমকে তাদের সব বিধায়ককে ১০ মে পর্যন্ত চেন্নাইয়ে অবস্থান করতে বলেছে। ডিএমকের শীর্ষ সূত্র এনডিটিভিকে জানিয়েছে, এমন একটি পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে যেখানে ই পালানিস্বামী মুখ্যমন্ত্রী হবেন এবং বাইরে থেকে ডিএমকে সমর্থন দেবে।
ডিএমকের তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশ, বিশেষ করে উদয়নিধি স্টালিন ঘনিষ্ঠরা আশঙ্কা করছেন, বিজয় ক্ষমতায় এলে তিনি এম জি রামচন্দ্রনের মতো দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন। কিংবদন্তি এমজিআর জীবিত থাকা পর্যন্ত ডিএমকেকে ক্ষমতার বাইরে রেখেছিলেন। তবে এম কে স্টালিনসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এখনও এমন পরিকল্পনায় পুরোপুরি রাজি নন বলে সূত্র জানিয়েছে। কয়েক দশক ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা দুই দল একসঙ্গে সরকার গঠন করলে জনরোষ তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
অন্যদিকে এআইএডিএমকেও তাদের বিধায়কদের ‘অপেক্ষা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ’ করতে বলেছে। দলের একটি অংশ টিভিকের সঙ্গে জোটে আগ্রহী হলেও জ্যেষ্ঠ নেতারা তা নাকচ করেছেন।
এর আগে গত বুধবার সন্ধ্যায় পালানিস্বামীর সঙ্গে বৈঠকে ৪৫ জনের বেশি বিধায়ক অংশ নেন। সেখানে তিনি বলেন, টিভিকে ও এআইএডিএমকের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই এবং এই মুহূর্তে দলভাঙানোর প্রশ্নও ওঠে না। বিধায়কদের আরও দুই দিন শান্ত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গভর্নরের অবস্থানে টিভিকের সম্ভাব্য মিত্ররাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) তামিলনাড়ু শাখা বলেছে, সংবিধান অনুযায়ী একক বৃহত্তম দল হিসেবে টিভিকেকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া উচিত। শপথের আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে বলা ‘অনুচিত’ বলেও মন্তব্য করেছে দলটি।
সিপিআই এক বিবৃতিতে বলেছে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এস আর বোম্মাই মামলাসহ বিভিন্ন রায়ে এই নীতি নিশ্চিত করেছে যে একক বৃহত্তম দলকে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ দিতে হবে।
বিদুথালাই চিরুথাইগাল কাছি (ভিসিকে) নেতা থোল থিরুমাভালাভানও বলেছেন, একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়কে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘গভর্নর টিভিকেকে সমর্থন দেয়া সদস্যদের তালিকা চাইতে পারেন না। তিনি বলতে পারেন না যে— ‘১১৮ জনকে নিয়ে আসুন, তারপর শপথ নিতে আসুন’।
টিভিকে অবশ্য ডিএমকের কাছ থেকেও সমর্থন পেয়েছে। বিদায়ী দলটি গভর্নরের সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং ‘জনরায়ের প্রতি অসম্মান’ বলে মন্তব্য করেছে। অভিনেতা কমল হাসানও বিজয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।