একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যে পৃথিবীর বুকে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ কোনো ভূখণ্ড নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত, তাৎক্ষণিক যোগাযোগ সক্ষম এক বিশাল বিশ্বগ্রাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি নাগরিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে ডাটা, ইন্টারনেট আর টেলিকমিউনিকেশনের অদৃশ্য তরঙ্গের ওপর ভর করে। এই যে দূরকে নিকট করার, সংযোগহীনকে সংযুক্ত করার এবং মানুষের মেধাকে বৈশ্বিক সম্পদে রূপান্তরের মহাযজ্ঞ-তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত বিবর্তন।
প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয় ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস’। আধুনিক সমাজ গঠনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপরিহার্য ভূমিকাকে উদযাপন করা এবং ইন্টারনেটের সুফলকে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বৈশ্বিক আয়োজন। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত দিবস নয়, এটি মূলত মানবসভ্যতার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক বার্ষিক ইশতেহার।
এই বিশেষ দিনটির শিকড় প্রোথিত রয়েছে আজ থেকে ১৬১ বছর আগে, ঊনবিংশ শতাব্দীর এক ঐতিহাসিক ক্ষণে। ১৮৬৫ সালের ১৭ মে ফ্রান্সের প্যারিসে বিশ্বের ২০টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল প্রথম আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ কনভেনশন। একইসঙ্গে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ‘আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ ইউনিয়ন’-এর, যা আজকের দিনে আমাদের কাছে ‘আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন’ নামে পরিচিত। জাতিসংঘভুক্ত এই সংস্থাটি বিশ্বের প্রাচীনতম আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অন্যতম।
পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে স্পেনের মালাগায় অনুষ্ঠিত আইটিইউ-এর এক সম্মেলনে ১৭ মে দিনটিকে ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দূরযোগাযোগের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির রূপান্তর ঘটে; টেলিগ্রাফের যুগ পেরিয়ে পৃথিবী প্রবেশ করে কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং সেলুলার নেটওয়ার্কের যুগে। ফলস্বরূপ, ২০০৫ সালের নভেম্বরে তিউনিসে অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব তথ্য সমাজ শীর্ষ সম্মেলন’-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৭ মে দিনটিকে ‘বিশ্ব তথ্য সমাজ দিবস’ হিসেবেও উদযাপনের আহ্বান জানায়। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে আইটিইউ তার তুরস্কের সম্মেলনে এই দুটি উদ্যোগকে একীভূত করে নাম দেয় ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস’। সেই থেকে প্রতি বছর একটি সুনির্দিষ্ট এবং সময়োপযোগী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই দিবসটি পালন করে আসছে।
টেলিযোগাযোগের ইতিহাস মূলত মানুষের যোগাযোগের আদিম আকুতিকে প্রযুক্তির ফ্রেমে বাঁধার ইতিহাস। ১৮৬৫ সালে যখন এই যাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ শুরু হয়, তখন দূরপাল্লার যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল মোর্স কোডের মাধ্যমে পাঠানো টেলিগ্রাফের তার। এরপর আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের হাত ধরে এলো টেলিফোন, যা মানুষের কণ্ঠস্বরকে তারের মধ্য দিয়ে মাইলের পর মাইল দূরে পৌঁছে দিল। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বেতার তরঙ্গের ব্যবহারে বিপ্লব ঘটলো-জন্ম নিল মোবাইল ফোন।
এনালগ থেকে ডিজিটাল, ২জি থেকে শুরু করে আজকের ৫জি নেটওয়ার্কের যুগে এসে টেলিযোগাযোগের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আজকের দিনে টেলিযোগাযোগ মানে কেবল দুটি মানুষের মধ্যে কথা বলা নয়; এটি হলো কোটি কোটি ডিভাইসের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান, যাকে আমরা ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ বলি। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অপটিক্যাল ফাইবার কেবল নেটওয়ার্ক আজ পুরো পৃথিবীকে তথ্যের এক মহাসড়কে রূপান্তর করেছে। এর ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনোদন এখন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।
আজকের দিনে ‘তথ্য সমাজ’ বলতে এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝায়, যেখানে তথ্যের সৃষ্টি, বিতরণ, ব্যবহার এবং ম্যানিপুলেশনই হলো প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তি। ইন্টারনেট এই তথ্য সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
ইন্টারনেট আজ কর্মসংস্থানের সীমানাকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিয়ে গেছে। আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, যা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনছে।
করোনাকালীন দূরশিক্ষণ থেকে শুরু করে আজকের ওপেন-সোর্স লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষার আলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিগুলো এখন একটি ক্লিকের দূরত্বে অবস্থান করছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ রোগীও এখন ভিডিও কলের মাধ্যমে রাজধানীর বা বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন, যা জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মানকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্টের আবেদন, কর প্রদান থেকে শুরু করে যে কোনো সরকারি সেবা এখন ঘরে বসেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে। এটি সরকারি সেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এনেছে এবং দুর্নীতি হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রূপান্তর এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। ২০০৮ সালে ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পের সফল বাস্তবায়নের পর দেশ এখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে।
এক সময় বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ছিল উচ্চবিত্তের বিলাসিতা। আজ দেশের ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের হাতে মোবাইল সংযোগ রয়েছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ফোর-জি নেটওয়ার্ক দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে গেছে এবং ফাইভ-জি চালুর প্রস্তুতি চলছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশে বাংলাদেশের নিজস্ব উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বৈশ্বিক ইন্টারনেটের সঙ্গে দেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী ও নির্বিঘ্ন করা হয়েছে। গ্রামীণ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো আজ প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় তথ্যপ্রযুক্তির সেবা পৌঁছে দিচ্ছে, যা এই দিবসের মূল চেতনার সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রযুক্তির এই চোখ ধাঁধানো অগ্রগতির মুদ্রার উল্টো পিঠে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবসে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ন্নত দেশের তুলনায় অনুন্নত দেশে বা শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও উচ্চগতির ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে একটি বড় অংশ ডিজিটাল সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সমাজে নতুন এক ধরনের বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে।
ইন্টারনেট যত বিস্তৃত হচ্ছে, সাইবার হ্যাকিং, ডাটা চুরি, অনলাইন জালিয়াতি এবং আর্থিক খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকি তত বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শক্তিশালী সাইবার প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে খুব দ্রুত গুজব ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিকে বিঘ্নিত করছে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে তথ্য সমাজ এক বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ ব্যাহত করছে এবং সামাজিক আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্নতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং বৈষম্যহীন তথ্য সমাজ গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। করণীয় বিষয়গুলোর রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো-
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের খরচ আরও কমিয়ে আনতে হবে, যাতে সুবিধাবঞ্চিত এবং প্রান্তিক শিক্ষার্থীরাও কোনো বাধা ছাড়াই তা ব্যবহার করতে পারে। প্রত্যন্ত ও পার্বত্য অঞ্চলেও নেটওয়ার্কের সমতা নিশ্চিত করতে হবে।
কেবল ডিভাইসের প্রাপ্যতা নয়, বরং ডিভাইস ও ইন্টারনেটকে কীভাবে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করতে হয়, সেই শিক্ষা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়াতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমেই নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়মাবলি শেখানো জরুরি।
সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ফিশিং লিংক চেনার উপায় এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এআই মেশিন লার্নিং এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে বিশ্ববাজারে আমরা পিছিয়ে না পড়ি।
প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়, বরং এটি মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার। বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণ। কোনো মানুষ যেন তার ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তথ্যের এই আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই এই দিবসের মূল অঙ্গীকার।
১৮৬৫ সালের সেই ১৭ মে যে দূরদর্শী যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ তা মানবজাতিকে মহাবিশ্বের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আসুন, আমরা এমন এক তথ্য সমাজ বিনির্মাণে কাজ করি, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার হবে নিরাপদ, মানবিক এবং বৈষম্যহীন। প্রযুক্তির আলোর সুষম বণ্টনই পারে একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও কুসংস্কারমুক্ত সুন্দর আগামীর পৃথিবী গড়ে তুলতে।