ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে পণ্যমূল্য নিয়ে দুঃসংবাদ দিল বিশ্বব্যাংক। যুদ্ধের কারণে চলতি বছর জিনিসপত্রের দাম গড়ে ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এই বৈশ্বিক সংস্থা।
কমোডিটি মার্কেট আউটলুক বা পণ্যবাজার–বিষয়ক পূর্বাভাস ২০২৬–এর এপ্রিল সংস্করণে বিশ্বব্যাংক বলেছে, জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির (ইএমডিই) দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি হবে। এসব দেশের গড় মূল্যস্ফীতি চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে এমনিতেই তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এখন মূল্যস্ফীতি আরও বাড়লে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
২০২২ সালের পর এবারই পণ্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে পূর্বাভাস দিল বিশ্বব্যাংক। পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে ঘিরে জ্বালানিবাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর। অর্থাৎ জ্বালানির দাম কতটা বাড়ে বা কমে, এর ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ওঠানামা করবে। সরবরাহঘাটতির কারণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ইতিমধ্যে বেড়েছে। ফলে ২০২৬ সালে গড় জ্বালানি মূল্য ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম এ বছর ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার হতে পারে, জানুয়ারি মাসের হিসাবের তুলনায় যা ২৬ ডলার বেশি।
কীভাবে দাম বাড়বে
চলমান এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুদ্ধ ও পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এতে নানা পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রপ্তানিতে বিঘ্ন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে ব্যবহৃত সারের দামও এ বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের চাপে খাদ্যপণ্য ও ধাতুর দাম বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ ধাতুর গড় দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠতে পারে। মূল্যবান ধাতুর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পণ্যের দামের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি এখনো বেশি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা আরও জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে ২০২৬ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১৫ ডলারের মধ্যে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্যান্য পণ্যের দামও পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
যুদ্ধের আগে অবশ্য পরিস্থিতি ভালোই ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে এখন অনেক বাজার অস্থির হলেও ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কৃষিপণ্যের মূল্যসূচক মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। সংঘাতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসে খাদ্যপণ্যের উপসূচক ২২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পাম ও সয়াবিন তেলের মতো জৈব জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে এসবের ভূমিকা আছে।
তবে কৃষিপণ্য সূচকের ভেতরে ভিন্ন চিত্রও ছিল। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোকো ও কফির সরবরাহসংকট ধীরে ধীরে কেটে যাওয়ায় পানীয় পণ্যের দামে বড় ধরনের পতন ঘটে। এতে সামগ্রিকভাবে কৃষিপণ্যের দাম কিছুটা সামাল দেওয়া যায়।
যুদ্ধ শুরুর আগে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও মার্চ মাসে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সারের মূল্যসূচক হঠাৎই ২০২২ সাল–পরবর্তী সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। গত এক দশকের হিসাবে দেখা যায়, মাসভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম উত্থান। এর মূল কারণ ইউরিয়ার দাম এক মাসে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি কার্যত থমকে যাওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে ইউরিয়ার দাম তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করেনি। মার্চের শেষে ইউরিয়ার যে দাম ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তা প্রায় একই অবস্থায় ছিল। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির পর থেকে অন্যান্য সারের দামও কিছুটা বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, ফলে সারের দাম বাড়ছে
বাংলাদেশেও প্রভাব পড়ছে
মূল্যস্ফীতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ সালে বিশ্বের সব দেশেই মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যায়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু অন্যান্য দেশ সেই চক্র থেকে বেরিয়ে এলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।
চলমান জ্বালানিসংকটের কারণে ইতিমধ্যে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল। এই তেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, দেশের ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ। অন্যান্য জ্বালানি তেলের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। কেরোসিনের দাম ১১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ ও পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই মাসে আবার দাম ৫ টাকা কমিয়ে ১৩০ ও ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর সরকার প্রতি মাসে জ্বালানির দাম নির্ধারণের নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু সেবার জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুরু হয়, সেই চক্র থেকে এখনো বেরোনো সম্ভব হয়নি।
দেখা যায়, জ্বালানির দাম বাড়লে বাজারে তার প্রভাব পড়ে। কারখানার খরচ বেড়ে যায়, বৃদ্ধি পায় পরিবহন ব্যয়, পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে। কৃষক থেকে ভোক্তা—সবাই চাপে পড়ে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতি কমে যায়—অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে নিত্যদিনের জীবনে।